ভারতের পেস আক্রমণের দুর্বলতা কোথায়, তা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। ভারতের ব্যাটিং লাইনআপ এতটাই শক্তিশালী যে বিশ্ব ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের কেন্দ্রস্থল এখন ভারতকে বলা যায়। তবে দেশটির বোলিং ইউনিট ব্যাটিংয়ের মতো শক্তিশালী নয়। মাঝেমধ্যেই ভারতের ক্রিকেটে বোলিং বিভাগ নিয়ে হতাশার চিত্র উঠে আসে। সর্বশেষ কয়েকটি সিরিজ শেষে সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
Table of Contents
Toggleকেন আলোচনায় ভারতের বোলিং আক্রমণের দুর্বলতা?
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে ২৫৯ রান তোলে কিউই দল। নীতিশ কুমার রেড্ডি, মায়াঙ্ক যাদব, প্রিন্স যাদব, এমনকি অক্ষর প্যাটেলও রানের লাগাম টানতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিছুদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ৩৫১ রান করেও ম্যাচ জিততে পারেনি ভারত। এমনকি ২০২৬ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেও বোলিং ব্যর্থতায় ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হারতে হয়েছে ভারতকে। ফলে ভারতের বোলিং লাইনআপের শক্তি নিয়ে আবারও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতের বোলিং সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে
বোলিং নিয়ে ভারতের হতাশা নতুন কিছু নয়। বোলিং ব্যর্থতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ ও টুর্নামেন্টও হারতে হয়েছে ভারতকে। ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার সুযোগ পেয়েও জহির খান ও জাভাগাল শ্রীনাথদের বোলিং ব্যর্থতায় অস্ট্রেলিয়া ৩৬০ রান তুলেছিল। অতিরিক্ত থেকেই এসেছিল ৩৭ রান, যার মধ্যে ওয়াইড ছিল ১৬টি এবং নো বল ৭টি। তা ছাড়া ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেমিফাইনালে হার, ২০১৭ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে বড় ব্যবধানে পরাজয় এবং ২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১০ উইকেটে সেমিফাইনালে হার—সবই ভারতের বোলিং ইউনিটের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
বুমরাহর পেস আর কুলদীপের স্পিনেই ভারতের শক্তি
বিগত কয়েক বছরে ভারতের বোলিং ইউনিটের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন জাসপ্রিত বুমরাহ ও কুলদীপ যাদব। ভারত সর্বশেষ ২০২৪ ও ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে, যার পেছনে বড় অবদান ছিল জাসপ্রিত বুমরাহর। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে ৪.১৭ ইকোনমি রেটে বোলিং করে ১৫টি উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টসেরা হয়েছিলেন তিনি। প্রায় পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া দলকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে ম্যাচ জিতিয়েছিলেন বুমরাহ। শুধু তাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ অনেক ম্যাচ ও সিরিজে ভারতকে একাই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি। বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা পেস বোলার হিসেবেও বিবেচিত হন জাসপ্রিত বুমরাহ। অন্যদিকে, কুলদীপ যাদবের স্পিন গত কয়েক বছর ভারতের স্পিন বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যদিও বর্তমানে বয়সের কারণে ভারতের মূল একাদশে নিয়মিত জায়গা পাচ্ছেন না তিনি।
বুমরাহহীন নিষ্প্রাণ ভারতের বোলিং ইউনিট
বুমরাহর অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে ভারত ক্রিকেট ক্যারিয়ারে বেশ কিছু ট্রফি ঘরে তুলতে পেরেছে। মাঝে মোহাম্মদ শামি মোটামুটি ভালো পারফর্ম করায় বোলিং ইউনিটে কিছুটা ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মোহাম্মদ সিরাজ, আর্শদীপ সিং ও প্রসিধ কৃষ্ণারা ভালো লাইন-লেংথ বজায় রাখলেও ব্যাটারদের বিপদে ফেলার মতো বোলিং করতে পারছেন না। কিছু ম্যাচে ব্যাটারদের ভুলের কারণে ভালো করলেও প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের খুব বেশি ভুগতে দেখা যায় না। স্পিন আক্রমণে বরুণ চক্রবর্তী ও ওয়াশিংটন সুন্দরদের বোলিং দেখে দীর্ঘমেয়াদি ভরসা খুঁজে পাওয়া কঠিন। সেদিক থেকে রবি বিষ্ণোইয়ের বোলিংয়ে ব্যতিক্রমী কিছু সম্ভাবনা দেখা গেলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে তিনি দলে জায়গা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, জাসপ্রিত বুমরাহর ঘন ঘন চোট এবং বয়স বাড়ার বিষয়টি ভারতের বোলিং লাইনআপ নিয়ে চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বুমরাহ দলে না থাকলে ভারতীয় বোলিং আক্রমণকে বেশ সাদামাটা মনে হয়। তাঁর অবসরের পর এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যাটিং নির্ভর ক্রিকেটের আড়ালে ভারতীয় বোলিংয়ের নেপথ্য সংকট
ভারতীয় ক্রিকেটে মূলত বোলিংয়ের চেয়ে ব্যাটিংয়ের প্রতি আগ্রহ ও ঝোঁক বেশি। তরুণ প্রজন্ম শচীন টেন্ডুলকার, বিরাট কোহলি ও রোহিত শর্মাদের দেখে বেশি অনুপ্রাণিত হয়। তাছাড়া আইপিএলেও সূর্যবংশী ও অভিষেক শর্মার মতো তারকা ব্যাটাররা চার-ছক্কার ফুলঝুরি দিয়ে আলোচনায় আসায় তরুণ ক্রিকেটাররা ব্যাটিংয়ের প্রতি আরও বেশি ঝুঁকছে। ঘরোয়া ক্রিকেটেও ব্যাটিংবান্ধব পিচ তৈরি করা হয়, যেখানে বোলারদের খুব বেশি কিছু করার থাকে না। ফলে বোলাররা আলোচনায়ও তুলনামূলক কম আসেন। এটিও নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের বোলিংয়ের প্রতি আগ্রহ হারানোর অন্যতম কারণ।
বিশ্বমানের বোলার তৈরিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নতুন পরিকল্পনা
টিম ইন্ডিয়ার বোলিং সমস্যা সম্পর্কে বিসিসিআইয়ের চেয়ে বেশি আর কারও জানার কথা নয়। বিষয়টি বুঝেই বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বিসিসিআই। এর মধ্যে রয়েছে উদীয়মান বোলারদের রাজ্য দলের অধীনে পুরোপুরি না ছেড়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তাঁদের চোট ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি করা। এর ফলে উমরান মালিক, মায়াঙ্ক যাদব ও আকাশ দীপের মতো সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের হারিয়ে যেতে না দিয়ে তাঁদের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করে সেরা বোলারদের কাতারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
তাছাড়া সেন্টার অব এক্সিলেন্সের অধীনে তিনটি মাঠে ৪৫টি উইকেট তৈরি করেছে ভারত। সেখানে বিভিন্ন ধরনের পিচে বোলিং অনুশীলনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উপমহাদেশের বাইরের কন্ডিশনে ভালো পারফর্ম করার লক্ষ্যে ঘরোয়া ক্রিকেটে লাইভলি পিচ বা ঘাসযুক্ত উইকেট তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বোলাররা অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মতো দেশের কন্ডিশনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবেন। তবে এতসব উদ্যোগের পরও বিসিসিআই তরুণ প্রজন্মকে বোলার হওয়ার জন্য যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করতে পারেনি। সুযোগ-সুবিধা তৈরির পাশাপাশি মৌলিক দক্ষতাসম্পন্ন খেলোয়াড় তুলে আনতে পারলেই ভারতের বোলিং সমস্যার সমাধান সম্ভব হতে পারে।