বিশ্ব ক্রিকেট বর্তমানে এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে গেছে যেখানে অর্থনৈতিক ভাবে এগেয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক বিভিন্ন কন্ডিশনে মানিয়ে নেয়ার মত অনেক জায়গা তৈরি হয়েছে। আর ক্রিকেটের এই বৈশ্বিকরনে সবচেয়ে বেশি অবদান ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটের আসর আইপিএলের।
বৈশ্বিক বাজারে ক্রিকেটের কদর আইপিএল, বিগ ব্যাশ, সিপিএল সহ অনেক আসর বাড়িয়ে তুললেও বাংলাদেশের ক্রিকেটারা তুলনামূলক অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বড় বড় আসর গুলোতে বাংলাদেশী ক্রিকেটাররা নিজেদের মূল্যবান করে তুলতে পারেনি। ফলে শীর্ষ টুর্নামেন্টগুলিতে বিরাট কোহলী, জস বাটলার, মিশেল স্টার্কদের সাথে ড্রেসিং রুম শেয়ার করে শেখার যে পরিধি তা বাংলাদেশের ক্রিকেটারা বাড়িয়ে তুলতে পারেনি।
Table of Contents
Toggleপ্লেয়ার ড্রাফটে থাকলেও অবিক্রিত থাকছেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা
আইপিএল সহ প্রায় সব আসরে বাংলাদেশী অনেকের নাম ড্রাফটে থাকলেও শেষ পর্যন্ত দল পাওয়া খেলোয়াড়দের হার খুবই কম। সাকিব আল হাসান, মুস্তাফিজ ছাড়া বাংলাদেশী বাকিদের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাতে দেখা যায় না ফ্রাঞ্চাইজি লীগ গুলোকে। আইপিএলের নিলামের একটি আসরে বাংলাদেশের ১২ জনকে ড্রাফটে রাখলেও অনেককে নিলামের টেবিলেই উঠানো হয়নি। এমনকি পাকিস্তানের পিএসএলে ৩৬ জনকে ড্রাফটে রাখলেও অল্প কয়েক জন দল পেলেও বাকিরা সবাই অবিক্রিত থেকে যান।
প্রায় সব ধরনের ফ্রাঞ্চাইজি লীগে বিদেশী খেলায়াড়দের কোটা ৩ থেকে জন থাকে। বাংলাদেশীদের দলে ভিড়িয়ে একাদশে খেলানোর মত জায়গা দেখেন না বিদেশী লীগ গুলো। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বাংলাদেশের দলীয় পারফরম্যান্সও বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বিবেচনায় না নেয়ার অন্যতম কারনের মধ্যে একটি।.
মোস্তাফিজ ও সাকিবের মত জাত চেনাতে ব্যর্থ অন্যরা
বাংলাদেশকে নিয়ে ফ্রাঞ্চাইজি লীগ গুলোর অনীহা থাকলেও মোস্তাফিজুর রহমান এবং সাকিব আল হাসান নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে ফ্রাঞ্চাইজি লীগ গুলোর নজরে এসেছেন। দু জনই শুধু নাম লেখানোয় নয় একাদশে জায়গা নিয়ে পারফরম্যান্স করেছেন। ফলে আসরের পর আসর বিভিন্ন ফ্রাঞ্চাইজির হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। সাকিব আল হাসানের কলকাতা নাইট রাইডার্স সহ বেশ কিছু ফ্রাঞ্চাইজির হয়ে শিরোপা জেতারও রেকর্ড রয়েছে। লিটন কুমার দাস, তাওহীদ হৃদয়রা বিভিন্ন টুর্নামেন্টে সুযোগ পেলেও দলগুলোকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
ব্যাটিং গড় ও স্ট্রাইক রেট মানানসহ রাখতে ব্যর্থ
আন্তর্জাতিক এবং ঘরোয়া লীগ গুলোতে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বর্তমানে যে স্থানে পৌঁছে গেছে সেখানে স্ট্রাইক রেট এবং ব্যাটিং গড় ফ্রাঞ্চাইজির নজড়ে আসার সবচেয়ে বড় মানদন্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারতের অভিষেক শর্মার আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১৯৬ স্টাইক রেটের পাশাপাশি এভারেজ ৩৬ এর উপর। ফ্রাঞ্চাইজি লীগে ডাক পাওয়া বেশিরভাগ খেলোয়াড়দের স্ট্রাইক রেট ১৫০ এর আশেপাশে কিংবা তারও বেশি। সেখানে বাংলাদেশী প্রথম সারির প্রায় সব ব্যাটারদের এভারেজ ১২০ এর আশেপাশে। পাশাপাশি এভারেজও প্রায় সবার ২৫ রানের নিচে। যা বাংলাদেশী ব্যাটারদের প্রতি আগ্রহ না থাকার অন্যতম কারনের একটি।
তাছাড়াও বাংলাদেশী ব্যাটারদের বিধ্বস্তী ইনিংস হাতে গোনা কয়েকটি। বোলিংয়েও আহামরি কোন স্পেল নেই। এমনকি সাকিব আল হাসান অনেক ফ্রাঞ্চাইজি লিগে অংশগ্রহন করলেও তার ব্যাটিং ছিল হতাশাজনক। অনেক গুরুত্বপূর্ন ম্যাচে সাকিব ব্যাট হাতে কোন ভূমিকাই রাখতে পারেনি।
পাওয়ার হিডিং সক্ষমতার অভাব
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের স্ট্রাইক রেটে ঘাটতির একটি গভীর কাঠামোগত কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের ঘরোয়া পিচগুলো সাধারণত ধীর গতির এবং নিম্ন বাউন্সের হয়ে থাকে । এই ধরনের উইকেটে খেলা ক্রিকেটারদের রক্ষণাত্মক এবং ঝুঁকি-বিমুখ করে তোলে। এই পরিবেশ মানসম্মত পাওয়ার হিটিং বা টপ-কোয়ালিটির পেস বোলিং বিকাশে বাধা দেয়। স্থানীয় খেলোয়াড়রা যখন আন্তর্জাতিক বা উচ্চ-স্কোরিং ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের ফ্ল্যাট উইকেটে খেলেন, তখন তাদের স্ট্রাইক রেট বাড়াতে সংগ্রাম করতে হয়।
বর্তমান সময়ে প্রতিটি ফ্রাঞ্চাইজি পাওয়ার হিডিং এ ক্যাপাবল খেলোয়াড়দের দলে ভেড়াতে চায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশী ব্যাটারদের দিকে তাকানোর কোন সুযোগ নেই দলগুলোর। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ন সময়ে বড় ইনিংস খেলে ম্যাচ ফিনিশ করার মত ফিনিশার বাংলাদেশে তৈরি হয়নি। ফলে খুব স্বভাবত বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ হারানোর উপকরণ খুঁজে পায় ফ্রাঞ্চাইজি লীগগুলো।
সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ
সব কিছুর পরেও বাংলাদেশের বেশ কয়েক জন খেলোয়াড় বাহিরের লীগে যতটুকু সুযোগ পেয়েছিল তা কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের প্রতি একটি নেগেটিভ মাইন্ডসেট তৈরি হয়েছে দলগুলোর মধ্যে। লঙ্কান প্রিমিয়ার লীগের মত আসরেও নিজেদের কে প্রমান করতে ব্যর্থ হয়েছে তাওহীদ হৃদয়, তাসকিন শরিফুলরা। আইপিএলের মত আসরে সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি আব্দুর রাজ্জাক, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মোহাম্মদ আশরাফুল, লিটন কুমার দাসরা।ফলে আস্থার জায়গায় একটি বড় ঘাটতি পড়ে গেছে।
বাংলাদেশীদের উল্লেখযোগ্য লীগে অংশগ্রহন
| খেলোয়াড়ের নাম | ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের নাম | দেশ |
|---|---|---|
| সাকিব আল হাসান | ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) | ভারত |
| পাকিস্তান সুপার লিগ (PSL) | পাকিস্তান | |
| বিগ ব্যাশ লিগ (BBL) | অস্ট্রেলিয়া | |
| ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (CPL) | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | |
| লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (LPL) | শ্রীলঙ্কা | |
| মেজর লিগ ক্রিকেট (MLC) | ইউএসএ | |
| ইন্টারন্যাশনাল লিগ টি-টোয়েন্টি (ILT20) | ইউএই | |
| মুস্তাফিজুর রহমান | ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) | ভারত |
| পাকিস্তান সুপার লিগ (PSL) | পাকিস্তান | |
| ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (CPL) | ওয়েস্ট ইন্ডিজ | |
| লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (LPL) | শ্রীলঙ্কা | |
| তামিম ইকবাল | পাকিস্তান সুপার লিগ (PSL) | পাকিস্তান |
| মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ | পাকিস্তান সুপার লিগ (PSL) | পাকিস্তান |
| মুশফিকুর রহিম | পাকিস্তান সুপার লিগ (PSL) | পাকিস্তান |
| লিটন দাস | ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) | ভারত |
| পাকিস্তান সুপার লিগ (PSL) | পাকিস্তান | |
| তাসকিন আহমেদ | লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (LPL) | শ্রীলঙ্কা |
| তৌহিদ হৃদয় | লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (LPL) | শ্রীলঙ্কা |
| শরিফুল ইসলাম | লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগ (LPL) | শ্রীলঙ্কা |
| নাসির হোসেন | মেজর লিগ ক্রিকেট (MLC) | ইউএসএ |
বিসিবি’র কঠোর এনওসি নীতি: আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির অগ্রাধিকার
বিদেশী লীগে ডাক পাওয়া নিয়ে হতাশা থাকলেও যতটুকু সুযোগ পাওয়া গেছে তার বিসিবির এনওসির কারনে তার অনেক কিছুই পন্ড হয়ে গেছে। তাসকিন আহমেদের বিষয়ে একাধিক বার আইপিএল থেকে আগ্রহ দেখালেও বিসিবির এনওসি না পাওয়ায় যাওয়া হয়নি তাসকিনের। তাছাড়া মোস্তাফিজ, সাকিব আল হাসান, লিটন কুমার দাসদের পুরো সময়ের জন্য লীগ গুলো না পাওয়ায় অনাগ্রহের মাত্রা তীব্র হয়েছে।
বিভিন্ন লীগে বাংলাদেশীদের আর্থিক মূল্যায়ন
| খেলোয়াড়ের নাম | লিগের নাম (সংক্ষেপ) | পিএসএল ক্যাটাগরি (যেখানে প্রযোজ্য) | মূল্য (সর্বোচ্চ চুক্তি/ক্যাটাগরি) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| সাকিব আল হাসান | IPL | প্রযোজ্য নয় | ₹3.20 কোটি | নিলামে প্রাপ্ত অন্যতম সর্বোচ্চ মূল্য। |
| সাকিব আল হাসান | PSL | প্লাটিনাম/ডায়মন্ড | $70,000 থেকে 1,70,000 (প্রায়) | পিএসএল-এ প্লেয়ার ক্যাটাগরি মূল্য সীমা। |
| সাকিব আল হাসান | CPL | প্রযোজ্য নয় | $1,10,000 (প্রায়) | CPL-এ চুক্তির দাম। |
| মুস্তাফিজুর রহমান | IPL | প্রযোজ্য নয় | ₹6 কোটি | বদলি খেলোয়াড় হিসেবে চুক্তি (বাংলাদেশী খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ)। |
| মুস্তাফিজুর রহমান | PSL | ডায়মন্ড/গোল্ড | $50,000 থেকে 1,20,000 (প্রায়) | পিএসএল-এ প্লেয়ার ক্যাটাগরি মূল্য সীমা। |
| মুস্তাফিজুর রহমান | LPL | প্রযোজ্য নয় | আইকন প্লেয়ার | সরাসরি চুক্তি, মূল্য প্রকাশ করা হয়নি। |
| মাশরাফি মোর্তুজা | IPL | প্রযোজ্য নয় | $6 লাখ (প্রায় ₹2.76 কোটি) | সে সময় বাংলাদেশী খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ IPL মূল্য। |
| তামিম ইকবাল | PSL | ডায়মন্ড/গোল্ড | $50,000 থেকে 1,20,000 (প্রায়) | পিএসএল-এ প্লেয়ার ক্যাটাগরি মূল্য সীমা। |
| মুশফিকুর রহিম | PSL | গোল্ড/সিলভার | $25,000 থেকে 70,000 (প্রায়) | পিএসএল-এ প্লেয়ার ক্যাটাগরি মূল্য সীমা। |
| মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ | PSL | ডায়মন্ড/গোল্ড | $50,000 থেকে 1,20,000 (প্রায়) | পিএসএল-এ প্লেয়ার ক্যাটাগরি মূল্য সীমা। |
| লিটন দাস | IPL | প্রযোজ্য নয় | ₹50 লাখ | ভিত্তিমূল্যে বিক্রি। |
| লিটন দাস | PSL | গোল্ড/সিলভার | $25,000 থেকে 70,000 (প্রায়) | পিএসএল-এ প্লেয়ার ক্যাটাগরি মূল্য সীমা। |
| তাসকিন আহমেদ | LPL | প্রযোজ্য নয় | $50 হাজার (প্রায়) | LPL নিলামে প্রাপ্ত মূল্য। |
| তৌহিদ হৃদয় | LPL | প্রযোজ্য নয় | $15 হাজার (প্রায়) | LPL নিলামে প্রাপ্ত মূল্য। |