© Photo by paddynapper on Flickr, CC BY 2.0, via Wikimedia Commons – Image resized
Table of Contents
Toggleশ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে সোনালী সময়: যখন লঙ্কানরা ছিল অপ্রতিরোধ্য
ক্রিকেট মাঠে শ্রীলঙ্কার সোনালি দিনগুলোর কথা ভাবলে মনের ভেতর একটা অন্যরকম অনুভূতি জাগে। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে মোটামুটি ২০১০ সাল পর্যন্ত, এই সময়টা ছিল লঙ্কান ক্রিকেটের সেরা সময়। একটা দল যখন শুধু প্রতিপক্ষকে হারানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং খেলার ধরনটাই বদলে দেয়, তখন সেই সময়টাকে সোনালি না বলে উপায় নেই। সনাৎ জয়াসুরিয়া যখন ব্যাট হাতে নামতেন, তখন মনে হতো তিনি যেন শুধু ছক্কা মারতেই এসেছেন। প্রতিপক্ষ বোলারদের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়াটা তার জন্য ছিল ডালভাত। তার সঙ্গী ছিলেন আরেক ব্যাটিং কিংবদন্তি অরবিন্দ ডি সিলভা। আর মাঝের সারিতে ছিলেন কুমার সাঙ্গাকারা এবং মাহেলা জয়াবর্ধনে—ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম সেরা জুটি, যারা দলের ব্যাটিংকে একটা ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এই দুইজনের ক্লাস এবং ধৈর্য যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি থেকে দলকে বের করে আনতে পারতো। বোলিংয়ে ছিলেন মুত্তিয়া মুরালিধরন, যিনি ছিলেন এককথায় জাদুকর। তার স্পিন বুঝা প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। চামিন্ডা ভাসের মতো বোলারও ছিলেন, যিনি সুইং আর লাইন-লেন্থ দিয়ে ব্যাটসম্যানদের নাজেহাল করতেন। এই ক্রিকেটাররা শুধু ভালো খেলোয়াড়ই ছিলেন না, তারা ছিলেন শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের আত্মা। তাদের পারফরম্যান্স শুধু ম্যাচ জেতানো ছিল না, বরং তা ছিল একটি জাতির গর্বের প্রতীক।
অভিজ্ঞদের শূন্যতায় টালমাটাল দ্বীপরাষ্ট্রের ক্রিকেট
ক্রিকেট মাঠে একটা সময় ছিল যখন একটা দলের পারফরম্যান্স নির্ভর করতো তাদের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ওপর। আর এই ব্যাপারটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে আজকের দিনের লঙ্কান ক্রিকেটে। অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অরবিন্দ ডি সিলভা, সনাৎ জয়াসুরিয়া বা চামিন্ডা ভাসের মতো কিংবদন্তীরা যখন একসঙ্গে অবসরে গেলেন, তখন দলের মধ্যে একটা বড়সড় শূন্যতা তৈরি হলো। সেই শূন্যতা আজও পূরণ করা সম্ভব হয়নি। একটা দল যখন এমন বড় তারকাদের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন তাদের অবসরের পর নতুনদের ওপর চাপটা অনেক বেড়ে যায়। লঙ্কান ক্রিকেটে এখন ঠিক এটাই হচ্ছে। কুশল মেন্ডিস, পাথুম নিসাঙ্কা বা চারিথ আসালাঙ্কার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড় থাকলেও, তারা সেই চাপ সামলে দলের হাল ধরতে হিমশিম খাচ্ছেন। অভিজ্ঞতার অভাবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তারা যেন দিশা হারিয়ে ফেলেন। বোলিংয়েও অবস্থা আরো শোচনীয়। লাসিথ মালিঙ্গার মতো একজন ডেথ ওভার স্পেশালিস্টের অভাব স্পষ্ট। ফলে, যে দলটি একসময় ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তি ছিল, সেই দলটাই এখন অনেকটাই সাদামাটা হয়ে গেছে। এটা খুবই দুঃখজনক যে, প্রতিভার কোনো অভাব না থাকলেও, অভিজ্ঞতার অভাবে দলটি তাদের পুরনো গৌরব ফিরে পাচ্ছে না।
সাবেক পরাশক্তির করুণ পতন
একসময় ক্রিকেট বিশ্বে শ্রীলঙ্কা ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্ক। দলটা এমন ছিল যে, বাংলাদেশ বা জিম্বাবুয়ের মতো দলগুলো তাদের সাথে জেতার কথা ভাবতেও পারতো না, শুধু সম্মানজনকভাবে হারার চেষ্টা করতো। কিন্তু সময়টা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সেই দাপুটে দলটি এখন নিয়মিতই ছোট দলের কাছে হেরে যাচ্ছে। সত্যি বলতে, আজকের শ্রীলঙ্কাকে দেখলে মনেই হয় না যে, এই দলটা একসময় ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ জিতেছিল বা তার পরপরই একের পর এক ফাইনাল খেলেছিল। দিলশান বা জয়াবর্ধনের মতো লড়াকু মানসিকতার ক্রিকেটার এখন আর তাদের দলে চোখে পড়ে না। আজকের দলটা যেন ক্রিকেট মাঠে এক অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। কুশল পেরেরা বা দিমুথ করুণারত্নের মতো ক্রিকেটারদের মাঝে মাঝে কিছু ঝলক দেখা গেলেও, তারা দলের জন্য ধারাবাহিক পারফরম্যান্স উপহার দিতে ব্যর্থ। একটা সময় ছিল যখন একটা ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই ধরে নেওয়া যেত যে শ্রীলঙ্কা জিতবে, কিন্তু এখন তাদের প্রতিটি ম্যাচেই হারের আশঙ্কা থাকে। এটা দেখতে সত্যিই খুব কষ্ট হয়।
লঙ্কান ক্রিকেটের পতন: বিশ্লেষক ও সংবাদ মাধ্যমের চোখে
শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের এমন করুণ পরিণতি দেখে বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের বিশ্লেষণ উঠে আসছে। অনেক ক্রিকেট বিশ্লেষকের মতে, লঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডে দুর্নীতি ও রাজনীতির সরাসরি প্রভাব এর প্রধান কারণ। তার মতে, যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবশালীদের পছন্দের খেলোয়াড়দের দলে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা দলের ভিত্তি নষ্ট করে দিয়েছে। অন্যদিকে, ক্রিকেট বিষয়ক জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফো তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্বল কাঠামোই এই পতনের অন্যতম কারণ। তাদের যুক্তি, ফার্স্ট-ক্লাস লিগগুলো আন্তর্জাতিক মানের চ্যালেঞ্জের জন্য তরুণদের প্রস্তুত করতে পারছে না, যার ফলে তারা চাপের মুখে ভেঙে পড়ছে।
এছাড়া, শ্রীলঙ্কার সাবেক ক্রিকেটার ও বর্তমান ধারাভাষ্যকার রাসেল আর্নল্ড মনে করেন, সঠিক মেন্টরশিপের অভাব নতুন প্রজন্মের ব্যর্থতার মূল কারণ। তার মতে, সাঙ্গাকারা, জয়াবর্ধনে বা মুরালিধরনের মতো কিংবদন্তীরা বোর্ডের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে তরুণরা তাদের মূল্যবান অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এই সব কারণের বাইরেও একটা বড় সমস্যা হলো, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দল তাদের চিরায়ত লড়াকু মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছে। একসময় যে দলটা হারতে জানতো না, তারা এখন নিয়মিত হারকে মেনে নিয়েছে। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে শুধুমাত্র অবকাঠামোগত পরিবর্তন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না।
লঙ্কান ক্রিকেটের পতনের নেপথ্যে
ক্রিকেট মাঠে একটি দেশের পারফর্মেন্স শুধুমাত্র মেধা বা অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে না, বরং এর পেছনে কাজ করে অনেক অদৃশ্য কারণ। শ্রীলঙ্কার বর্তমান ক্রিকেট দলের ব্যর্থতার মূল কারণগুলো একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ক্রিকেট বোর্ডের দুর্নীতি। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, ক্রিকেটের মতো একটি আবেগপূর্ণ খেলায়ও রাজনীতির নোংরা প্রভাব পড়েছে। শোনা যায়, যোগ্যতার চেয়ে প্রভাবশালীদের পছন্দের খেলোয়াড়রা প্রায়শই দলে সুযোগ পান। এর ফলে মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন হয় না, যা দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি, বোর্ডের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে, যা তরুণদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। লাহিরু থিরিমান্নে ও কুশাল পেরেরার মতো ক্রিকেটাররা যখন তাদের অভিজ্ঞতার জন্য বোর্ডের সমর্থন পান না, তখন দলের ভেতরে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়। অন্যদিকে, ঘরোয়া ক্রিকেটের মানও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেটের কাঠামো দুর্বল হওয়ায় তরুণ ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক শক্তি অর্জন করতে পারছেন না। ফলাফল? শ্রীলঙ্কার মতো একসময়ের পরাশক্তি এখন যেন দিশাহীন এক দল। এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে সবার আগে দরকার বোর্ডের শুদ্ধিকরণ এবং ক্রিকেটকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা।
সঙ্কট উত্তরণে লঙ্কান ক্রিকেটের নতুন পরিকল্পনা
লঙ্কান ক্রিকেট তাদের বর্তমান করুণ দশা থেকে বেরিয়ে আসতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে তাদের মূল লক্ষ্য হলো ক্রিকেটীয় কাঠামোকে ঢেলে সাজানো এবং হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করা। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড (SLC) নতুনভাবে ঘরোয়া ক্রিকেটকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করছে। তারা চাইছে ফার্স্ট-ক্লাস টুর্নামেন্টগুলোতে দল সংখ্যা কমিয়ে মান বাড়াতে, যাতে প্রতিযোগিতার তীব্রতা বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরি হয়। এটা আমার কাছে একটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়। কারণ, দুর্বল ঘরোয়া কাঠামোই অনেক প্রতিভার বিকাশে বাধা দিচ্ছিল।
এছাড়া, বোর্ডের পক্ষ থেকে তরুণ প্রতিভাদের পরিচর্যার জন্য বিশেষ প্রোগ্রাম শুরু করা হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে উদীয়মান খেলোয়াড়দের ক্রিকেটীয় দক্ষতা এবং মানসিক দৃঢ়তা বাড়ানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে বোর্ডের দূরত্ব কমানোর জন্যও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মেন্টর হিসেবে দলে বা কোচিং স্টাফে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে। এটা খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ, কারণ অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অরবিন্দ ডি সিলভা বা সনাৎ জয়াসুরিয়ার মতো কিংবদন্তিদের অভিজ্ঞতা নতুনদের জন্য অমূল্য সম্পদ হতে পারে। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি, বোর্ড দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা যদি সত্যিই কার্যকর হয়, তাহলে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে।