বদলে যাওয়া বাংলাদেশ: টি-টোয়েন্টিতে কি সত্যিই ফিরেছে আত্মবিশ্বাস?

আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ দল – টি-টোয়েন্টিতে নতুন যুগের সূচনা

© Photo by Tourism Victoria on Flickr, licensed under CC BY 2.0, via Wikimedia Commons – Image resized

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের হতশ্রী পারফরম্যান্স নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে অনেক আলোচনা সমোলোচনা রয়েছে। দর্শকদের প্রত্যাশা পূরনে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের ক্রিকেট বয়কটেরও স্লোগান করেছে ভক্ত সমর্থকরা। অবশেষে সর্বশেষ ১০ টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ৬ টিতে জিতে সমর্থকদের সমর্থন অনেকটা পূনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ দল। বিশেষ করে আফগানিস্তান দলকে ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ হারানোয় বাংলাদেশ দল এখন আত্নবিশ্বাসের তুঙ্গে। এশিয়া কাপে ফাইনাল খেলার সুযোগ অল্পের জন্য হাতছাড়া হলেও বাংলাদেশ দলের জন্য এশিয়া কাপেও অনেক প্রাপ্তির জায়গা ছিল।

ম্যাচ প্রতিপক্ষ জয়/পরাজয় জয়/পরাজয়ের ব্যবধান
১ আফগানিস্তান জয় ১৫ রান
২ আফগানিস্তান পরাজয় ৩ উইকেট
৩ আফগানিস্তান জয় ৭ উইকেট
৪ শ্রীলঙ্কা জয় ৮৩ রান (বড় জয়)
৫ শ্রীলঙ্কা পরাজয় ৫ উইকেট
৬ শ্রীলঙ্কা জয় ৮ উইকেট
৭ যুক্তরাষ্ট্র জয় ৪ উইকেট
৮ যুক্তরাষ্ট্র জয় ৬ উইকেট
৯ যুক্তরাষ্ট্র পরাজয় ৩ রান
১০ আফগানিস্তান পরাজয় ৭ উইকেট

বাংলাদেশ দলে আত্নবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জায়গা আসলে কোথায়?

তবে, অনেক কিছু ছাপিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে বর্তমান সময়ে কিছু কৌশল গত ও মানসিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে কোচিং প্যানেলে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছি। শুরুর দিকে দলের পারফরম্যান্স কোচিং প্যানেলকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেও বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ দল ফিল সিমন্স, মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের অধীনে আত্নবিশ্বাস পেতে শুরু করেছে। মোস্তাফিজুর রহমান, নাসুম আহমেদ এর পাশাপাশি সাইফ হাসান, তানজিদ তামিমরা দলকে আশা দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশ দলের এই আন্তবিশ্বাস জনক পারফরম্যান্সের মাঝেও অনেক হতাশার জায়গা রয়েছে। ব্যাটিংয়ে ভাল শুরুর পর সেই জায়গাটাকে ধরে রেখে বড় স্কোর করতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ দল। তবে,বাংলাদেশ দল নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে সমর্থ হয়েছে। শামীম পাটোওয়ারী, নুরুল হাসান সোহান, পারভেজ ইমন সহ ব্যাটিং লাইনআপের সবাই বড় শর্ট খেলার সক্ষমতা দেখিয়েছে। শুধুমাত্র উইকেটে টিকে থাকতে পারলে ২০০ রান পর্যন্ত পৌঁছতে পারার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

নির্ভরতা কাটিয়ে উঠার মিশন

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টিতে বর্তমান সাফল্যের উল্লেখযোগ্য কারনগুলো:

  • পাওয়ার হিডিং কোচ জুলিয়ান উডের অধীনে ট্রেইনিং
  • পাওয়ার হিডিংয়ে সক্ষম তরুন প্রতিভাদের আগমন
  • ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলার লাইসেন্স
  • খেলোয়াড়দের ফিটনেস ও ফিল্ডিংয়ে যথেষ্ট উন্নতি
  • বোলিং ব্যাটিংয়ে সমন্বয় খুঁজে পাওয়া

বাংলাদেশ দলের বর্তমান সাফল্যকে বিশ্লেষণ করতে হলে,  টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের পূরোনো পারফরম্যান্স টেনে আনতে হবে। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে।  যার মধ্যে প্রায় ৪০ পারসেন্ট ম্যাচ জয়ের রেকর্ডের পাশাপাশি প্রায় ৫৭ পারসেন্ট ম্যাচ হারার রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের জয়ের বেশিরভাগই এসেছে যেসব দল এখনো টেস্ট ম্যাচে অংশ গ্রহন করছে না তাদের বিপক্ষে। এমনকি আফগানিস্তানের বিপ্ক্ষে সর্বশেষ ৪ টি ম্যাচের আগে ১০ টি ম্যাচের মোকাবেলায় বাংলাদেশের জয় ছিল মাত্র ৩ টি।

বাংলাদেশ দল ২০২৫ সাল পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ম্যাচে হারের স্বাক্ষী হয়েছে। সর্বশেষ কিছু সিরিজে বাংলাদেশ দলের সাফল্য তাই আলাদা করে বলার মতই। সাকিব আল হাসান সহ অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের বিদায়ে যে ঘাটতি দেখা দিয়েছিল তা কাটিয়ে উঠার নমুনা দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে। বাংলাদেশ দল হয়তো বুঝতে শিখছে নির্ভরতা কাটিয়ে উঠে দল হয়ে পারফর্ম করতে হবে টিকে থাকতে হলে।

টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ছন্দের শুরু কিভাবে?

সর্বশষ দুটি বছর ২০২৪-২০২৫ সাল লিটন দাসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল অনেকটা ছন্দে ফিরেছে। সর্বশেষ তিনটি টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশ দল শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান এবং নেদারল্যান্ডকে হারিয়েছে। এর মধ্যে শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় ছিল বাংলাদেশের জন্য স্পেশাল। যে ভিত্তি এখন বাংলদেশকে আন্তবিশ্বাস দিচ্ছে ভাল কিছু করার। মোস্তাাফিজের ছন্দ ফিরে পাওয়া আর তরুন ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স আগামী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে বড় স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

প্রতিপক্ষের মানের প্রেক্ষাপট

প্রথম সারির দলগুলোর বিপক্ষে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এই ছন্দ ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ন। ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ ১৭ টি ম্যাচ খেলে মাত্র ১ টিতে জিততে পেরেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৯ ম্যাচ খেলে এখনো জয়ের দেখা পায়নি বাংলাদেশ। তাছাড়া বাংলাদেশের জয়ের বেশিরভাগই ছিল মিরপুরের উইকেটে। মিরপুরের বাহিরে এসে অ্যাওয়ে ম্যাচে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে বাংলাদেশের অর্জিত জয়গুলো অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য বিশেষ কিছু। ঠিক যে সময়ে আরব আমিরাতের বিপক্ষে হার নিয়ে সমোলোচিত হচ্ছিল বাংলাদেশ।

নেতৃত্ব ও কৌশলগত স্থিতিশীলতা

বাংলাদেশ দলে অধিনায়ক পরিবর্তন যেন হরহামেশা ব্যাপার। এই জায়গা থেকে সরে এসে বিসিবি লিটন দাশের উপর দীর্ঘ মেয়াদী টি-টোয়েন্টি অধিনায়কের দায়িত্ব অর্পণ করে। ফলে লিটন দাস এবং বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট ঠিক একই কমিটমেন্টে আসতে পারছিল। শামীম হোসেন, জাকির হোসেন, তানজিদ তামিমরা দীর্ঘ দিন ধরে অধরাবাহিক থাকলেও দল তাদের উপর আশ্বাস রেখেছে। শুধু তাই নয় লিটন কুমার দাস নিজেও সর্বশেষ দুই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এতটাই খারাপ করেছেল যে লিটন দাস যাতে আর কখনো টি-টোয়েন্টি দলে বিবেচিত না হন সেই আলোচনাও উঠেছিল। সেই জায়গা থেকে লিটন দাসের নেতৃত্বে দলকে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দেখেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। লিটন দাস সর্বশেষ কিছু ম্যাচে ধারাবাহিক পারফর্ম করে দলের পাশাপাশি নিজেকেও অনেকটা খুঁজে পেয়েছেন।

কোচিং প্যানেলকেও ঢেলে সাজানোর কার্যকারীতা

শুধু অধিনায়কত্ব নয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কোচিং প্যানেলের মধ্যেও যুগান্তকারী বড় পরিবর্তন এনে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা মাথায় এনেছিল। সাকিব আল হাসান, মাশরাফি, তামিমদের নিজেদের খারাপ সময়ে মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সরনাপন্ন হতে দেখা গেছে বহুবার। তবে তিনি অজানা কারনে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের অধীনে আসতে পারছিলেন না। সালাউদ্দিনকে সহকারী কোচের দায়িত্ব দিয়ে খেলোয়াড়দের গঠনের দায়িত্ব বাংলাদেশ ক্রিকেট  বোর্ড তাকে দিয়েছে। গত বিপিএল চলাকালীন ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার মঈন আলী স্বীকার করেছিলেন তার দেখা সেরা কোচদের একজন হলেন সালাউদ্দিন। ফিল সিমন্সকে দলকে বেশি সময় দেয়া সাপেক্ষে বিসিবি হেড কোচের দায়িত্ব দিয়েছে। ফলে দলের মধ্যে একটি স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে।

পাওয়ার প্লে ও ডেথ ওভারে কৌশলগত পরিবর্তন

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ দল নিজেদের গতানুগতিক এটাকেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। মোস্তাফিজ আইপিএলে যেভাবে সফলতা পেয়েছেন ঠিক সেভাবেই পাওয়ার প্লের শেষের দিকে এবং ডেথ ওভারে বোলিং করিয়ে মোস্তাফিজের সেরাটা বের করে নিয়ে আসতে পেরেছে বাংলাদেশ। তাছাড়াও নাসুম আহমেদ, রিশাদ হোসেন, মেহেদী হাসানদের স্পিনকে পাওয়ার প্লে এবং মিডল ওভারে এটাকিং অপশন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাওহীদ হৃদয়, শামীম হোসেন পাটওয়ারীরা নিজেদের সক্ষমতা জানিয়ে দিয়েছে। ফলে এক ভারসম্য পূর্ন ক্রিকেট দলে পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে বাংলাদেশ।

আধুনিক ক্রিকেটের সাথে তাল মেলাচ্ছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং লাইন আপের স্ট্রাইক রেট নিয়ে এতদিন ধরে যে আলোচনা চলমান ছিল। সেসব আলোচনায় মাটি চাপা দিতে যেন বাংলাদেশী ব্যাটারার বদ্ধ পরিকর। বাংলাদেশী প্রায় সব খেলোয়াড়দের টি-টোয়েন্টিতে স্ট্রাইক রেট ১২০ এর আশেপাশে। সাম্প্রতিক কিছু ম্যাচে পাওয়ার প্লের পূর্ন ব্যবহার সহ ১৫০ এর ও বেশি স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করতে দেখা গেছে সাইফ হাসান, তানজিদ তামিম, শামীমদের। আফগানিস্তান সিরিজে বাংলাদেশ দল ১৯ টি ছক্কা মেরেছে। সাইফ হাসান শেষ ম্যাচে ৭ টি ছক্কা হাঁকিয়েছে। পারভেজ ইমন  এমনকি লোয়ার অর্ডারে খেলা রিশাদ হোসেনও ছক্কা মারার সক্ষমতা দেখিয়েছে। যা বাংলাদেশের নিয়মিত খেলার ধরনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।