Table of Contents
Toggleবিশ্ব ক্রিকেটের ম্যাপ: এখন আইসিসিতে ১২ পূর্ণ এবং ৯৮ সহযোগী দেশ আছে — সবাই কি এক-সুরে?
আইসিসির বর্তমান সদস্য তালিকা অনুযায়ী, ১২টি দেশের ‘পূর্ণ সদস্য’ রয়েছে—এরা সবাই টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-২০র মতো প্রধান আন্তর্জাতিক ফরম্যাট খেলার অধিকারী। অন্যদিকে, ৯৮টি ‘সহযোগী’ দেশ আছে, যাদের অধিকাংশই টি-২০ তে অংশ নিতে পারে, তবে কিছু নির্দিষ্ট মাত্রার পারফরম্যান্স প্রদর্শন করে ওডিআই স্ট্যাটাসও পেয়ে থাকে। এই পরিসংখ্যান কেবল তথ্য নয়—এটা আমাদেরকে ভাবায়, ‘এই বিপুল সংখ্যক সদস্যের মাঝে কি আইসিসি সবার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করছে?
কেন আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশের সংখ্যা এত সীমিত?
বিশ্বের শতাধিক দেশ ক্রিকেটে অংশ নিচ্ছে, তবুও আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ শুধুমাত্র ১২টি দেশকে সীমাবদ্ধ—এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং স্বচ্ছ ও কঠোর পরীক্ষার ফল। পূর্ণ সদস্য হতে হলে দেশটির ক্রিকেট বোর্ডকে প্রমাণ করতে হয় শক্তিশালী নির্ভরযোগ্য ইনফ্রাস্ট্রাকচার, যেমন এখনো নিয়মিত টেস্ট-সামর্থ্যধারী ঘরোয়া লিগ, দুটি বা তার বেশি আন্তর্জাতিক মানের মাঠ, এবং সার্বক্ষণিক নারী ও পুরুষ উভয় দলে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ। এছাড়া, পেছনের ৮ বছরের ভিতরে কমপক্ষে তিনবারের বিশ্বকাপ বা টি২০ বিশ্বকাপে উপস্থিতি ও কিছু পূর্ণ সদস্য দলের বিপক্ষে জয় অর্জন থাকতে হবে। এই মাপকাঠিগুলো ক্ষণস্থায়ী নয়—এগুলো ধারাবাহিক উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট সংস্কৃতির মাপকাঠি, যা সহযোগী দেশগুলোর কাছে অনেক সময় দূরদূরান্তের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। আবার বিষয়টি শুধু খেলার দক্ষতার নয়; সিস্টেম ও প্রশাসনিক সক্ষমতার দাবি তোলে, যা অনেক জাতিকে এই ‘এলিট ক্লাবে’ আসতে দেরি করিয়ে দেয়।
সহযোগী দেশে আইসিসির অবহেলা
বিশ্ব ক্রিকেট বিস্তারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সহযোগী দেশগুলোতে জনপ্রিয়তা তৈরি করা। অথচ আইসিসি এখানেই সবচেয়ে বেশি ব্যর্থ। পূর্ণ সদস্য দেশগুলো কোটি কোটি ডলার অনুদান পেলেও বেশিরভাগ সহযোগী দেশ বছরে মাত্র অল্প কিছু অর্থায়ন পায়, যা দিয়ে ঘরোয়া টুর্নামেন্ট, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা বয়সভিত্তিক ক্রিকেট চালিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ড প্রমাণ করেছে—যথেষ্ট বিনিয়োগ ও সুযোগ পেলে সহযোগী দেশও বিশ্বমানের ক্রিকেট উপহার দিতে পারে। তবুও আফ্রিকা, ইউরোপ কিংবা আমেরিকার অনেক দেশ এখনও প্রাথমিক স্তরে আটকে আছে শুধুমাত্র আর্থিক সহায়তা ও কাঠামোগত দিক থেকে আইসিসির অবহেলার কারণে। ফলাফল হিসেবে ক্রিকেট বিশ্বায়নের স্বপ্ন বারবার থমকে দাঁড়াচ্ছে।
আইসিসির আর্থিক বৈষম্য
আইসিসির আয়ের বণ্টন কাঠামো এমনভাবে সাজানো যে এতে প্রকৃত শক্তিশালী দেশগুলোর বাইরেও বহু পূর্ণ সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে ভারতীয় বোর্ড একাই মোট আয়ের প্রায় ৩৮ শতাংশের মতো অংশ ভোগ করছে, যেখানে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া মিলে পাচ্ছে আরও বড় অংশ। অথচ দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবা নিউজিল্যান্ডের মতো ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে ভাগ করতে হচ্ছে মাত্র কয়েক শতাংশ রাজস্ব। এই বৈষম্যের কারণে তাদের ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজন, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রতিভাবান ক্রিকেটার ধরে রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
আরও বড় সংকট তৈরি হয় যখন দেখা যায় নারী ক্রিকেট ও বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের মতো উন্নয়নমূলক খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে না অনেক পূর্ণ সদস্য দেশ। অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্রিকেট কেন্দ্র এখন খেলোয়াড়দের ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন লিগে হারাচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোও তাদের ক্রিকেটারদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে একদিকে “বিগ থ্রি” তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ ও টুর্নামেন্ট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে, অন্যদিকে বাকিরা টিকে থাকার লড়াই করছে। এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য ভেঙে দিচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত দর্শক ও ভক্তদের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
বিগ থ্রির প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রণ
পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর বড় একটি অংশ বিগ থ্রির আধিপত্য নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে ভয় পাচ্ছে। কারণ আইসিসির আর্থিক বণ্টন থেকে শুরু করে দ্বিপাক্ষিক সিরিজের সময়সূচি নির্ধারণ—সব কিছুতেই শেষ কথা বলে ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। তাদের স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিলে ছোট বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সদস্যদের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে সেই দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ট্যুর থেকে বঞ্চিত হতে পারে, আবার রাজস্ব আয়ের সুযোগও কমে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে অনেক পূর্ণ সদস্য দেশ নিজেদের ক্রিকেট কাঠামো চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়, যা বিশ্ব ক্রিকেটের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের জন্য হুমকি।
টেস্টে দ্বি-স্তর নীতির সংকোচন
আইসিসি যখন টেস্ট ক্রিকেটে দ্বি-স্তর নীতি চালুর প্রস্তাব তোলে, তখন সেটিকে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাস্তবে এই নীতি কার্যকর হলে শীর্ষস্থানীয় দলগুলো কেবল নিজেদের মধ্যেই বেশি সিরিজ আয়োজন করবে, যার ফলে তাদের রাজস্ব, দর্শক টানার ক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাব আরও বাড়বে। বড় দলগুলো পরস্পরের মধ্যে উচ্চমানের ম্যাচ খেলতে থাকবে এবং তাদের ক্রিকেট অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।
অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা নতুন টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলো নিম্ন স্তরে আটকে পড়বে, যেখানে তারা বড় দলের সঙ্গে নিয়মিত খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। এর ফলে তাদের আয়ের পথ সংকুচিত হবে, ক্রিকেটাররা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হারাবে এবং টেস্ট সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ কমে যাবে। বিশ্বব্যাপী টেস্ট ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দেওয়ার বদলে এই নীতি খেলাটিকে কিছু দেশেই সীমাবদ্ধ করে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্রিকেটের বৈশ্বিক প্রসারের বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
প্রসারের বদলে বাণিজ্যকরণ
আইসিসি সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এর আর্থিক দিককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। টুর্নামেন্ট আয়োজন, সম্প্রচার চুক্তি, স্পনসরশিপ ও বিজ্ঞাপনী রাজস্বের মতো খাতগুলোতে তাদের মূল মনোযোগ কেন্দ্রীভূত থাকছে। এর ফলে ক্রিকেট নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে, কারণ সহযোগী দেশগুলো আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতার সুযোগ পাচ্ছে না। বরং, বড় বাজারসমৃদ্ধ দেশগুলোতেই অধিকাংশ সিরিজ ও ইভেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে, যাতে বেশি দর্শক, বেশি টিভি রেটিং এবং বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা ক্রিকেটের বৈশ্বিক বিস্তারকে সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে এবং খেলাটিকে একটি আঞ্চলিক ও বাণিজ্যকেন্দ্রিক বিনোদনে রূপান্তর করছে।
আইসিসির নীতির কারণে ক্রিকেটে টেকনিকের অবমূল্যায়ন
আজকের তরুণ ক্রিকেটাররা ব্যাটিং টেকনিকের সূক্ষ্মতা শেখার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে পাওয়ার হিটিং অনুশীলনে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে আইসিসির নীতি, যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডার সংকুচিত করা হচ্ছে। দীর্ঘ ফরম্যাটে মনোবিবেশের সুযোগ কমে যাওয়ায় ক্রিকেটাররা বাণিজ্যিক চাহিদার সাথে খাপ খাওয়াতে বাধ্য হচ্ছে। যারা ছক্কা মারায় দক্ষ নয়, তাদের জন্য জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া কিংবা বড় ফ্র্যাঞ্চাইজিতে সুযোগ পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। আইসিসি যদি সত্যিই ক্রিকেটের প্রসার চায়, তবে তাদের উচিত ছিল ব্যালেন্সড সূচি তৈরি করে টেস্ট ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে সুরক্ষা দেওয়া; কিন্তু বাস্তবে তারা ক্রিকেটকে ধৈর্য ও টেকনিকের খেলা থেকে ধীরে ধীরে বানিজ্যিক “এন্টারটেইনমেন্ট শো”-তে রূপান্তর করছে।
সহযোগী দেশগুলোর আত্মত্যাগ ও আইসিসির অবহেলা
সহযোগী দেশগুলোর ক্রিকেটাররা নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজেদের স্বপ্ন পূরণে লড়ে যাচ্ছেন। নেপাল, ওমান, স্কটল্যান্ড কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনেক খেলোয়াড় চাকরির পাশাপাশি অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচে প্রতিনিধিত্ব করেন। অথচ এই বাস্তবতা আইসিসির জন্য এক বিরাট লজ্জার বিষয়, কারণ তারা চাইলে ক্রিকেটকে সবার জন্য সমানভাবে উন্নয়নের সুযোগ করে দিতে পারত। সমান আর্থিক সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নিয়মিত টুর্নামেন্টের ব্যবস্থা করলে সহযোগী দেশগুলো আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ক্রিকেট বিশ্বে এখনো এক ধরনের বিভাজন টিকে আছে, যা খেলাটির সার্বজনীন অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।