বাংলাদেশের ক্রিকেটে কোচ নাকি ফর্মহীন ক্রিকেটাররাই বাংলাদেশের আসল দুশ্চিন্তা, এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ক্রিকেটে বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কখনোই দীর্ঘমেয়াদি ফর্মে ছিল না বাংলাদেশ দল। মাঝে মাঝে কিছু জয়ের দেখা পেলেও তার ধারাবাহিকতা কখনোই ধরে রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। বর্তমান সময়ে জিম্বাবুয়ের সাথেও পেরে উঠছে না বাংলাদেশ। যে জিম্বাবুয়ে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়ছে, সেই জিম্বাবুয়ের সাথে নিয়মিত হারছে বাংলাদেশ। যা বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবস্থা জানান দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
Table of Contents
Toggleকোচ বদলই কি বাংলাদেশের ক্রিকেটে নিয়ম, নাকি ব্যর্থতার আড়ালে অন্য গল্প?
১৯৭৭ সালের পর থেকে বাংলাদেশ কোচ বদলিয়েছে ডজনেরও বেশি। যাদের প্রায় সবাইকেই ছাঁটাই করা হয়েছে বাংলাদেশ দলের ব্যর্থতার দায়ভার দিয়ে। রাসেল ডমিঙ্গো, চন্ডিকা হাথুরুসিংহ, গর্ডন গ্রিনিজ, রিচার্ড পাইবাসের মতো হাই-প্রোফাইল কোচও ছিলেন সেই কাতারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে হঠাৎ পাওয়া জয় উপহার দিলেও কেউই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শক্তিশালী করে তুলতে পারেননি। ফলে ব্যর্থ হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে সবাইকে। এত এত কোচ কেন বাংলাদেশের সমস্যা সমাধান করতে পারছেন না? তবে কি কোচরা নিজেদের সেরাটা দেননি? নাকি এই ব্যর্থতার পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু, যা কেউই মুখ ফুটে বলতে পারেননি বা জানলেও বলতে পারছেন না?
কোচকে দোষ দিয়ে কত দিন? বাংলাদেশের ক্রিকেটের আসল সমস্যা কি ক্রিকেটাররাই?
শুধু কোচদের দোষ দিয়ে আর কত দিন পার পাবে বাংলাদেশ? যে খেলাটির সঙ্গে ১৮ কোটি বাংলাদেশির আবেগ জড়িত, তা কি সাপোর্টিং স্টাফদের দোষ দিয়ে পার পাওয়া যাবে? বৈশ্বিক ক্রিকেট এতটাই এগিয়েছে যে ক্রিকেটাররা রানের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটারদের অবস্থা শোচনীয়। পূর্বে খেলেছেন আর বর্তমানে খেলছেন, এমন কোনো খেলোয়াড়ের ব্যাটিং গড় ৪০-এর ঘরে নেই। এমনকি শুধুমাত্র তাওহীদ হৃদয় ছাড়া ওয়ানডেতে ৩৫-এর বেশি গড় কারও নেই। শুধু তাই নয়, ধারাবাহিক পারফরমার বলতে যা বোঝায়, তার ছিটেফোঁটাও নেই বাংলাদেশ দলে।
লিটন দাস ১১ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের হয়ে খেলছেন। ব্যাটিং ব্যর্থতা তাঁর নিত্যসঙ্গী, আর এমন পারফরম্যান্স দিয়েও অধিনায়কত্ব করছেন তিনি। হয়তো এভাবেই শেষ বয়স পর্যন্ত খেলে যাবেন তিনি। ক্লাসিক ক্রিকেটারের তকমাই তো বাংলাদেশ ক্রিকেটে জায়গা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। ২০২১ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চরম হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর লিটন দাস ও সৌম্য সরকারকে টি-টোয়েন্টিতে বিবেচনায় না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরে সেই লিটন দাসই কোনো ধারাবাহিকতা ছাড়াই আবার টি-টোয়েন্টিতে ফিরেছেন। শুধু তাই নয়, হয়েছেন অধিনায়কও। সঙ্গী সৌম্য সরকারও কোনো পারফরম্যান্স না করেও মাঝে মাঝে জাতীয় দলে আসেন, আবার পারফরম্যান্স না করে ফিরেও যান। যাঁদের বিকল্পই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, নাকি বাংলাদেশে।
সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দুটি ইনিংসে ভালো ব্যাট করেছিলেন সাইফ হাসান। যার ওপর ভর করে বাংলাদেশ দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ এখন তিনি। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সব ফরম্যাটেই ৩০-এর নিচে এভারেজ তাঁর। তারপরও তিনি অটো চয়েজ হয়ে গেছেন। সাইফের ওপেনিং সঙ্গী তানজিদ তামিম, যাঁকে বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটার বলা হয়। তাঁরও ব্যাটিং গড় টেস্টে ৩১-এর কিছুটা বেশি, আর বাকি দুই ফরম্যাটে ৩০-এর নিচে। আর এটাই বাংলাদেশ দলের টপ অর্ডার ব্যাটারের অবস্থা। অথচ আফগানিস্তানের ব্যাটার ইব্রাহিম জাদরানের ব্যাটিং গড় ৫১-এর বেশি।
বাংলাদেশ দলের টপ অর্ডারের অবস্থা দেখে মিডল অর্ডারের ব্যাটারদের নিয়ে আর বেশি কিছু বলার নেই। কারণ, মিডল অর্ডারে ব্যাট করেন নুরুল হাসান সোহান, জাকের আলী অনিক, ইয়াসির রাব্বির মতো ব্যাটাররা। সোহান ৫৮টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন, যার সর্বোচ্চ ইনিংস ৪২ রানের। পাশাপাশি তিনি ১৭টি ওয়ানডে খেলেছেন, সর্বোচ্চ ৪৫ রান করেছেন। উইকেটরক্ষক ব্যাটার হিসেবে এমন পারফরম্যান্স দিয়েও ১০ বছর ধরে বাংলাদেশের হয়ে খেলে যাচ্ছেন সোহান।
ব্যাটিংয়ে ব্যর্থতা, বোলিংয়েও ধারাবাহিকতার অভাব—বাংলাদেশের সংকট কাটবে কবে?
শুধু ব্যাটিং নয়, বোলিংয়েও বাংলাদেশের অবস্থা যাচ্ছে-তাই। মাঝে মোস্তাফিজুর রহমান কিছুটা আশা দেখালেও তিনিও পথ হারিয়েছেন। হয়তো বাংলাদেশি বলেই। যেখানে অল্পতে তুষ্টি, সেখানে ধারাবাহিকতারই বা দরকার কী? জাসপ্রিত বুমরাহ, কাগিসো রাবাদা নিজেদের আরও শক্তিশালী করেছেন। বিপরীতে, মোস্তাফিজ তাঁর বোলিংয়ের অন্যতম অস্ত্র কাটারও হারিয়েছেন। এশিয়ার বাইরে অবস্থা এতটাই খারাপ যে মাঝে মাঝে জায়গাও হারাতে হয়েছে। পাশাপাশি, ইনজুরি থেকে রিকভার করতে না পেরে এখন টেস্টেও খেলছেন না। শুধু তিনি নন, একই অবস্থা তাসকিন আহমেদেরও। নতুন অস্ত্র নাহিদ রানাও ধারাবাহিক নন। স্পিনে সাকিবের বিদায়ের পর স্পিন বিভাগ একেবারেই সাদামাটা হয়ে গেছে।
সুযোগের পর সুযোগ, তবু পারফরম্যান্সে সেই পুরোনো চিত্র—কেন?
মূলত বাংলাদেশের হাতে বিকল্প কোনো অপশন না থাকায় পারফরমারহীন ক্রিকেটারদের দিয়েই কোনোমতে ক্রিকেটটা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড দলগুলোর হাতে পর্যাপ্ত বিকল্প থাকায় পারফরম্যান্স করে টিকে থাকতে হয় দলে। বিপরীতে, বাংলাদেশের বিকল্প অপশনগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন কোনো নতুন মুখও নেই, যাদের নিয়ে বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখতে পারে। যা বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ডুবিয়েছে।
বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিচিত মুখ বিপিএল, যেটাও কিনা মুখ থুবড়ে পড়েছে। যেটার প্রতি দেশের স্পনসর কোম্পানিগুলোর আগ্রহ নেই। ফলাফল, আইপিএল, পিএসএল যেখানে মিলিয়ন ডলার উপার্জন করে, সেখানে বিপিএল আয়োজন করে লস গুনতে হয় বিসিবিকে। এমনকি দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক না দিয়ে উল্টো সমালোচনা শুনতে হয়। ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় লিগের যখন এই অবস্থা, তখন ডিপিএলসহ অন্য লিগগুলোর বিষয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। ম্যাচ ফিক্সিং, স্বেচ্ছাচারিতা, নিজের পছন্দসই খেলোয়াড়দের খেলানোসহ শত শত অভিযোগ সব লিগে। এমনকি আম্পায়ারিংয়েও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ পাওয়া যায়।
তাছাড়া খেলোয়াড়েরাও নিজেদের ব্যাটিং-বোলিংয়ের সমস্যা সমাধানে কোনো উদ্যোগ নেন না। উল্টো, তাঁদের খারাপ পারফরম্যান্সেও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে কোনো হতাশার ছাপ নেই। অধিনায়কদের সংবাদ সম্মেলনে এসে অন্যদের সমর্থন করতে শোনা যায়। গোটা দলই যেখানে পারফরম্যান্সহীন, সেখানে তো একজন আরেকজনকে সমর্থন করবেই। শুভমান গিল, বিরাট কোহলিদের নিজেদের ধারাবাহিকতার গল্প শুনতে হয়, কিন্তু শত শত সমস্যার সমাধান যেন না করলেও চলে।
সবকিছু মিলিয়ে হয়তো সামনেও অনেক কোচ বাংলাদেশে আসবেন, আবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ফিরেও যাবেন। কিন্তু যাঁদের কারণে এত সব, তাঁরা হয়তো খেলেই যাবেন। আর যেটা সহ্য করা ছাড়া বাংলাদেশি সমর্থকদের করারই বা আছে কী? খেলোয়াড়েরা যখন বলেন, তাঁদের পারিশ্রমিক বাংলাদেশ থেকে নয়, আইসিসি থেকে দেয়, তখন তাঁদের কাছ থেকে জবাবদিহিতা চেয়েই বা লাভ কী? তবে একটি উপায় আছে। আপনি যদি ক্রিকেট ফ্যান হন, তাহলে বাংলাদেশকে অন্ধভাবে সমর্থন না করে ক্রিকেটকে উপভোগ করুন। সেটা যে দলই খেলুক না কেন।