কিংবদন্তী ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম: রিভার্স সুইংয়ের রাজা

কিংবদন্তী ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম: রিভার্স সুইংয়ের রাজা
রিভার্স সুইংয়ের রাজা ওয়াসিম আকরাম

কিংবদন্তী ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম রিভার্স সুইয়ের রাজা ছিলেন। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৮৪ সালে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে যাত্রা করে ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলে বিদায় নেন ক্রিকেটের এই মহারথী। ওভারের প্রতিটি বলে আলাদা আলাদা ডেলিভারি, নতুন ও পুরাতন বলে ইনসুইং, আউটসুইং, রিভার্স সুইচ সহ সব ধরনের বোলিং বৈচিত্র্য নিয়ে ক্রিকেটে নিজেকে চিনিয়েছেন কিংবদন্তী ক্রিকেটার ওয়াসিম। 

ওয়াসিম আকরাম এমন একজন খেলোয়াড় ছিলেন যার জন্য কন্ডিশন মেটার করত না। যেকোন কন্ডিশনে হাওয়ায় বল সুইচ করানোর বিশেষ গুন তার ছিল। কব্জির যথাযথ ব্যবহার করে সব ধরনের সুইং বোলিংয়ের রাজা ছিলেন তিনি। ব্যাটাররা সব সময় বল যেখানে পুরাতন হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। সে সময় পুরাতন বলে রিভার্স সুইং করিয়ে ব্যাটারদের আরও বিপদে ফেলতেন তিনি। বোলিংয়ে তিনি বড় রানআপ নিতেন না, শর্ট রানআপে বল ছাড়ার সময় দ্রুত বল ছাড়তেন তিনি। যা ওয়াসিম আকরামকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়।

বিশেষ পারফরম্যান্স

ওয়াসিম আকরাম ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জেতার ম্যাচে দুর্দান্ত বোলিং ও ব্যাটিংয়ে অবদান রেখে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়ার ম্যাচে ম্যান অফ দি ম্যাচ হয়েছিলেন। সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে ১৯ বলে ৩৩ রানের গুরুত্বপূর্ন ইনিংসের পাশাপাশি ইংলিশ দুই ব্যাটার অ্যালান ল্যাম্প ও নিল ফেয়ারব্রাদারকে রিভার্স সুইংয়ে পরাস্ত করে ব্যাক টু ব্যাক উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন। সেই ম্যাচে বোলিংয়ে ৪৯ রানে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন ওয়াসিম আকরাম।

তাছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৪ টি হ্যাট্রিকের মালিক। যা লাসিথ মালিঙ্কার ৫ টি হ্যাট্রিকের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ব্যাটিংয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে ৮ নম্বর পজিশনে নেমে ২৫৭ রানের ইনিংস রয়েছে তার। যা এই পজিশনের এখন পর্যন্ত রেকর্ড সর্বোচ্চ। ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম বোলার হিসেবে ৫০০ উইকেট শিকার করেছেন ওয়াসিম আকরাম। তাছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত সহ সব দেশকে বোলিংয়ে ভুগিয়েছেন ওয়াসিম আকরাম।

কাদের বিপক্ষে ওয়াসিম আকরাম সফল হয়েছেন?

ওয়াসিম আকরামের সফলতা বুঝার জন্য দেখতে হবে তিনি কাদের বিপক্ষে খেলে সফল হয়েছেন। ওয়াসিম আকরাম যেসময় খেলেছেন সেই সময়ে খেলেছেন শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, ভিভ রিচার্ডস, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট সহ অনেক তারকা ক্রিকেটার। যাদের বিপক্ষে বল করে সফলতা সহজ ছিলনা। ওয়াসিম আকরাম এমন একজন ছিলেন যিনি সব ব্যাটারদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে সফল হয়েছেন। যাকে সমীহ করত বিশ্বের সব বাঘা বাঘা খেলোয়াড়। যাকে নিয়ে প্রত্যেকটি দলকে আলাদা আলাদ প্লান করতে হত। অথচ সবার প্লানকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনিই জয়ী হতেন।

ওয়াসিম আকরামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ক্রিকেট বিশ্ব

ক্রিকেট বোঝেন কিন্তু ওয়াসিম আকরামকে চেনেন না বা তার বোলিং দেখেননি এটা হতেই পারেনা। তিনি এমন একজন বোলিং শিল্পী ছিলেন যাকে নিয়ে প্রশংসা করেননি এমন ক্রিকেটপ্রেমী খুঁজে পাওয়া যাবেনা। ব্র্যান্ড লারা নিজেও ওয়াসিম আকরামকে তার সময়ে খেলা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বোলার মনে করেন। দুদিকে সুইং করে বোকা বানানোর প্রতিভায় তিনি যে নিজেও বোকা বনতেন তা তিনি স্বীকার করেছেন।

ক্রিকেট কিংবদন্তী শচীন টেন্ডুলকার বলেছিলেন ওয়াসিম আকরাম বলকে কথা বলাতে পারতেন। তিনি বলেছিলেন তার বোলিং অ্যাকশন স্বাভাবিক হলেও বল ছাড়ার সময়ে তার গতি থাকত অবিশ্বাস্য। রিকি পন্টিং বলেছিলেন ওয়াসিম আকরাম নতুন বলে যতটা ভয়ংকর ছিলেন পুরাতন বলে তার চেয়েও বেশি। ইংলিশ ব্যাটার অ্যালান ল্যাম্প বলেছিলেন ১৯৯২ সালে তিনি ওয়াসিম আকরামের যে বলটিতে আউট হয়েছিলেন। সেই বলটি সামলানোর ক্ষমতা কোন ব্যাটারের নেই।

ক্রিকেট থাকবে কিন্তু ওয়াসিমরা আসে একবারই

বিশ্ব ক্রিকেটে অনেকে আসে অনেকে যায়। কিন্তু হাতে গোনা কয়েক জন আছে যারা স্মৃতির পাতায় থেকে যায়। ওয়াসিম আকরাম এমন একজন খেলোয়াড়, ক্রিকেট যতদিন থাকবে তাকে নিয়ে আলোচনা হবেই। সর্বকালের সেরাদের বিপক্ষে খেলে যে চ্যাম্পিয়ন হয় সেই তো আসল খেলোয়াড়। ক্রিকেট ইতিহাস হয়তো নতুন করে লেখা হবে অনেকবার কিন্তু সুলতান অফ সুইয়ের খেতাব থেকে যাবে একজনের দখলে।

তিনি যেখানে যান সেখানেই সুইং বোলিংয়ের তালিম নিতে হয় তার কাছ থেকেই। পেস বোলিংয়ের সাথে যুক্ত প্রত্যেকের স্পপ্নই থাকে ওয়াসিম আকরামের সাথে অন্তত পক্ষে একবার হলেও সুইং বোলিয়ের তালিম নেয়া। যে তালিকা থেকে বাদ যায়নি বর্তমান সময়ের মিশেল স্টার্ক, জাসপ্রিত বুমরাহ, মোস্তাফিজরাও। তিনিও যেন উপভোগ করেন বোলিং নিয়ে আলোচনা করা। আর করবেনইতে এটাতো তারই জগত। আর যে জগতের রাজা তিনি নিজেই। 

FAQ/সাধারণ জিজ্ঞাসা

১. ওয়াসিম আকরাম কতসালে কোথায় জন্মগ্রহন করেন?

উত্তর: ১৯৬৬ সালের ৩ জুন পাকিস্তানের লাহোরে এক পাঞ্জাবি পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।

২. তার পরিবারে কে কে আছে?

উত্তর:বর্তমান স্ত্রী শানিরা আকরাম। তার তিন সন্তান তাইমুর আকরাম, আকবর আকরাম ও আইলা আকরাম।

৩. ওয়াসিম আকরামের প্রথম স্ত্রী কে ছিলেন?

উত্তর: হুমা মুফতি ছিলেন প্রথম স্ত্রী। ১৯৯৫ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ২০০৯ সালে তিনি মারা যান।

৪. আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উইকেট সংখ্যা কত?

উত্তর: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুইং সুলতান ১০৪ টেস্টে ৪১৪ টি আর ওয়ানডেতে ৩৫৬ ম্যাচে ৫০২ টি উইকেট নিয়েছেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।