পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট পারফরম্যান্স কেমন?

বাংলাদেশ ও পাকিস্তান টেস্ট ক্রিকেট দলের মুখোমুখি ম্যাচগুলোর জয়ের হার, পরিসংখ্যান ও ঐতিহাসিক রেকর্ড
মুলতান টেস্টের প্রতীকী চিত্র

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জয় ১৯৯৯ সালে ওয়ানডেতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারানো। তবে টেস্ট ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম জয়  এসেছে ২০২৪ সালে এসে। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তানকে ২-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে সিরিজ জিতে নিয়েছিল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট জয় বলতে এ দুটিই।

কিভাবে বাংলাদেশ সিরিজ জিতেছিল?

বাংলাদেশের টেস্টে বড় কোন উন্নতির চিত্র না থাকলেও বাংলাদেশ যে কারনে টেস্ট গুলো জিতেছিল তা হল:

  • সিরিজের প্রথম টেস্টে মুশফিকুর রহিমের ১৯১ রানের অবিশ্বাস্য ব্যাটিং
  • সাকিব আল হাসান আর মেহেদী হাসান মিরাজের দুর্দান্ত স্পিন
  • নাজমুল হাসান শান্তর নেতৃত্ব
  • টপ অর্ডারে পাকিস্তানের ব্যাটিং ব্যর্থতা
  • বাংলাদেশকে হালকা ভাবে নেয়া
  • অধিনায়ক হিসেবে শান মাসুদের অনভিজ্ঞ সিদ্ধান্ত

কাছাকাছি গিয়েও হেরে যাওয়া ম্যাচ

বাংলাদেশ ২০০৩ সালে মূলতান টেস্টে জয়ের অনেক কাছকাছি থেকেও জিততে পারেনি। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ  ২৮১ রানে অলআউট হয়ে গেলে পাকিস্তান জবাবে তাদের প্রথম ইনিংসে ১৭৫ রানে গুঁটিয়ে গিয়েছিল। ১০৬ রানের লিড পাওয়া বাংলাদেশ। তবে দ্বিতীয় ইনিঙসে বাংলাদেশ মাত্র ১৫৪ রানে গুঁটিয়ে গিয়েছিল। ফলে পাকিস্তানের সামনে ২৬১ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়। মাত্র ১ উইকেট হাতে রেখে ২৬২ রান করে জয়ের লক্ষ্য পৌঁছায় পাকিস্তান।

মুলতান টেস্টে বাংলাদেশের হারার কারণ

মুলতান টেস্টে বাংলাদেশ হারলেও কিছু কারনে ম্যাচটি বিতর্কিত। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিজেদের কিছু ভুল থাকলেও সামগ্রিক কারনে ম্যাচটিতে পাকিস্তানের জয় অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। মুলতান টেস্টে বাংলাদেশের পরাজয়ের কারণগুলো নিচে দেয়া হল:

বিষয়বিস্তারিত
ম্যাচ পরিচিতি২০০৩ সালের মুলতান টেস্টে বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিপক্ষে ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি গিয়েও মাত্র ১ উইকেটে হেরে যায়। এই ম্যাচটি আজও বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে ট্র্যাজিক ও বিতর্কিত হারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
শেষ উইকেট ফেলতে না পারাপাকিস্তানের ৯ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ জয়ের একদম দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ইনজামাম-উল-হক ও উমর গুল শেষ উইকেটে গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ম্যাচ বের করে নেন।
ইনজামাম-উল-হকের অসাধারণ ইনিংসঅধিনায়ক ইনজামাম-উল-হক ১৩৮* রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে টেল-এন্ডারদের নিয়ে খেলেন এবং স্ট্রাইক নিজের কাছে রাখেন। শেষ উইকেটে উমর গুলের সাথে ৫২ রানের জুটি গড়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেন।
আম্পায়ারিং বিতর্কম্যাচে আম্পায়ার ছিলেন অশোক ডি সিলভা ও ডেভিড শেফার্ড। তাদের কয়েকটি সিদ্ধান্ত তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয় এবং বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে।
আলোক কাপালির বলে ইনজামামের ক্যাচআলোক কাপালির বলে ইনজামামের ব্যাটে লেগে বল স্লিপে ক্যাচ ধরা পড়লেও আম্পায়ার আউট দেননি। টিভি রিপ্লেতে বল ব্যাটে লাগার ইঙ্গিত দেখা যায়। এটি ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি।
রফিকের বলে ক্যাচ আউটের আবেদনমোহাম্মদ রফিকের বলে পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে একটি জোরালো ক্যাচ আউটের আবেদন আম্পায়ার নাকচ করেন, যা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
উমর গুলের এলবিডব্লিউ আবেদনশেষ উইকেটের সময় উমর গুলের বিপক্ষে জোরালো এলবিডব্লিউ আবেদন করা হলেও আম্পায়ার নট আউট দেন। সে সময় DRS না থাকায় সিদ্ধান্ত রিভিউ করার সুযোগ ছিল না।
স্নায়ুচাপ ও অভিজ্ঞতার অভাববাংলাদেশ তখন টেস্ট ক্রিকেটে নতুন দল ছিল। জয়ের খুব কাছে চলে যাওয়ার পর খেলোয়াড়দের মধ্যে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ফলে ফিল্ডিং সেটআপ ও বোলিংয়ে কিছু কৌশলগত ভুল দেখা যায়।
ফিল্ডিং ও ছোট ভুলকিছু মিসফিল্ড, অর্ধসুযোগ হাতছাড়া এবং ঢিলেঢালা বোলিং পাকিস্তানকে ম্যাচে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং ব্যর্থতাপ্রথম ইনিংসে বড় লিড পাওয়ার পরও বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ১৫৪ রানে অলআউট হয়ে যায়। আরও ৩০-৪০ রান যোগ করতে পারলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত।
আলোকস্বল্পতা বিতর্কম্যাচের শেষদিকে আলো কমে এলেও আম্পায়াররা খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনেকের মতে খেলা বন্ধ হলে পরদিন সকালে বাংলাদেশের বোলাররা বাড়তি সুবিধা পেত।
ঐতিহাসিক গুরুত্বহারলেও এই ম্যাচের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব ক্রিকেটকে দেখিয়ে দেয় যে তারা বড় দলগুলোকেও কঠিন চ্যালেঞ্জ দিতে সক্ষম। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলটসহ পুরো দল কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।

পাকিস্তানের বিপক্ষে কি বাংলাদেশ টেস্টে ব্যবধান কমিয়ে নিতে পেরেছে?

পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্টে সাফল্য বলতে ২০২৪ সালের ২ টি টেস্ট আর মুলতান টেস্টে কাছে গিয়েও হেরে যাওয়া। তবে ২০২৪ সালে যেহেতু পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে বাংলাদেশ সিরিজ জিততে পেরেছে তাই শক্তির পার্থক্য কমার ব্যবধান স্পষ্ট। পাকিস্তানের সেই সময়ের ফর্ম খারাপ থাকলেও বর্তমানে পাকিস্তান অনেকটা ঘুরিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভাল করতে হলে নিজেদের উন্নতি বজায় রাখতেই হবে। পাশাপাশি ম্যাচে আসা সুযোগ গুলো সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে হবে। সুযোগের অপব্যবহার মুলতান টেস্টের মত ফলাফল বয়ে নিয়ে আসতে পারে।

পাকিস্তানের বিপক্ষে জিততে বাংলাদেশকে কি করতে হবে?

পাকিস্তানের পারফরমেন্স সবসময় উঠানামা করে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ভাল করতে বাংলাদেশকে যা করতে হবে:

  • টপ অর্ডারদের ভাল পারফর্ম করতে হবে
  • ব্যাটিং লাইনআপ হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়া যাবে না
  • টপ অর্ডার ব্যাটারদের লোয়ার অর্ডারদের গাইড করে বড় পার্টনারশীপ করতে হবে
  • বোলারদের দ্রুত ব্রেকথ্রু দিতে হবে
  • পাকিস্তান চাপে পড়লে চাপটা ধরে রাখতে হবে
  • ক্যাচের সুযোগগুলো হাতছাড়া করা যাবে না
  • নিজেদের ব্যাটিং ইনিংসগুলো যতটা সম্ভব বাড়িয়ে নিতে হবে

সব মিলিয়ে বর্তমান সময়ে পাকিস্তানকে হারানো বড় কোন ব্যাপার নয়। বাবর আজম, রেজোয়ানদের মত ব্যাটাররা ফর্মহীন থাকায় পাকিস্তানকে হারানোর বড় ‍সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। তবে সব মিলিয়ে বাংলাদেশ টিম বলে কথা। যদিও বলি পাকিস্তানকে নিয়ে শেষ কথা বলা যায়না।  একই সমস্যা তো বাংলাদেশেরও। তাই বলা যায় বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে টেস্ট ম্যাচ এখন সমানে সমানে হবে। যে দলটি সুযোগ মিস কম করবে সেই দলেরই পাল্লা ভারি হবে। বাংলাদেশ কি পারবে নিজেদের পাল্লা ভারি করতে? হয়তো সময় বলে দেবে। তবে অসম্ভব কিছুই নয়। সম্ভাবনার কাজটুকু সারতে হবে বাংলাদেশ দলকেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।