সেরা দশে থাকা দলগুলোর সাথে বাংলাদেশের শক্তির পার্থক্য কেমন?

বাংলাদেশের সাথে অন্য টপ টেন ক্রিকেট দলের শক্তির পার্থক্যের চিত্র

সেরা দশে থাকা দরগুলোর সাথে বাংলাদেশের শক্তির পার্থক্য কেমন? বাংলাদেশ মূলত ১৯৭৭ সালে আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশ হিসেবে ক্রিকেট খেলা শুরু করে। পরে ১৯৮৬ সালে এসে ওয়ানডে স্টাটাস পেলেও ১৯৯৭ সালে এস আইসিসির স্থায়ী ওয়ানডে স্টাটাস পায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ক্রিকেট গ্রাফ উন্নতি শুরু বলা যায় ১৯৯৭ সালের পরের থেকে।

১৯৯৭ সালের পর বাংলাদেশ যখন ক্রিকেট নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখা শুরু করল। তখন জিম্বাবুয়ে অনেক প্রতিষ্ঠিত দল। জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের সোনালী সময় বলতে মূলত ১৯৯৫ থেকে ২০০৩ সালকেই ধরা হয়। সেই সময় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল কেমন ছিল সেটা বোঝার জন্য সে সময়কার জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের নামই যথেষ্ট। অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্রান্ড ফ্লাওয়ার, অ্যালিস্টার ক্যাম্বেল, নেইল  জনসনরা ব্যাটিংয়ে ছিল ত্রাস।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্রিকেটার ও ক্রিকেট ব্যবস্থা ধ্বংস হয় জিম্বাবুয়ের। ফলাফল বাংলাদেশের সাথেও হার শুরু। সেই রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বাংলাদেশের সাথে আর পেরে ওঠেনি দলটি। বাংলাদেশের ক্রিকেট জয় বলতে বিপক্ষ জিম্বাবুয়ে। ২০০৪ ও ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের সাথে বাংলাদেশ ওয়ানডে আর টেস্ট জয়ের দেখা যায়। মূলত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয়গেুলোই বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। জিম্বাবুয়ের দুর্দশাই যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে উঠে।

তবে জিম্বাবুয়ের পর টপ লিস্টেট আর কোন দলের বিপক্ষে আধিপত্য দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ। মাঝে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের খারাপ সময় গিয়েছিল। ফলে বাংলাদেশের সামনে ভাল সুযোগ এসেছিল অন্তত পক্ষে এসব দলকে টপকে যাওয়ার। র‌্যাঙ্কিংয়েও অন্তত একবার হলেও এসব দলের বিপক্ষে নাম উঠেছিল বাংলাদেশের। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় তারা আস্তে আস্তে কামব্যাক করলেও। বাংলাদেশ নিজেদের উন্নতি করতে ব্যর্থ হওয়ায় থমকে গেছে।

বাংলাদেশ দল ঠিক এমনভাবে থমকে গেছে যে আফগানিস্তান ক্রিকেট দল। ২০০৯ সালে অফিসিয়াল ওয়ানডে স্টাটাস লাভ করার পর তারা এখন বাংলাদেশের উপরের কাতারের দল। শুধু তাই নয় ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টিতে সেমিফাইনাল খেলে দলটি। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া আর দক্ষিণ আফ্রিকার মত দলের আতঙ্কের নাম এখন আফগানিস্তান ক্রিকেট দল। বাংলাদেশের চেয়ে আফগানিস্তান ক্রিকেট দলকে সমীহ করে বিপক্ষ দলগুলো। মূলত তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স এই স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের গ্রাফ কোনভাবেই আর উঠানো সম্ভব হচ্ছে না। মাঝে পঞ্চপান্ডবের মাঝারী পারফরম্যান্সে কিছুটা আশা জাগালেও পাইপ লাইন দুর্বল হওয়ার আর আগানো যায়নি। ভারতের সাথে বাংলাদেশের ক্রিকেটের শক্তির পার্থক্য এখন আকাশ পাতাল। যদিও ২০১৫ সালে বাংলাদেশে এসে পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে সিরিজ হেরেছিল ভারত।এর আগে পরে বাংলাদেশকে নিয়ে ছেলে খেলাই করেছে ভারত।  

ভারতের সাথে বাংলাদেশের শক্তির পার্থক্য  এতটাই যে বাংলাদেশকে দ্বি-পাক্ষিক সিরিজের জন্য আমন্ত্রণই জানায়না ভারত। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন ক্রিকেট আর দর্শক, স্পন্সর হারার শঙ্কায় এই কাজটি করছে বিসিসিআই। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের বিপক্ষে নির্ধারিত সিরিজ যেগুলো বাংলাদেশের মাটিতে হওয়ার কথা সেগুলোও বাতিল করার চিন্তা করছে ভারত।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ভান্ডার শূন্য না হলেও শক্তির পার্থক্য ব্যাপক। ২০০৫ সালে কার্ডিফে ওয়ানডে জয় অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশের ওয়ানডে ফরম্যাটে একমাত্র জয়। তাছাড়া ২০১৭ সালে ঢাকায় ১ টি টেস্ট ম্যাচে সাকিব আল হাসানের অল রাউন্ড পারফরম্যান্সে ২০ রানের জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ। তাছাড়াও ২০২১ সালে ঘরের কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে  ৪-১ এ টি-টোয়েন্টি সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০০৫ সালের ওয়ানডে জয়টি ছাড়া বাকি জয়গুলো পৃথিবীর বিরল উইকেট কন্ডিশন তৈরি করে পাওয়া। 

তবে মিরপুর কন্ডিশন বাদ দিলে যেকোন নিরপেক্ষ ভেন্যু এমনকি চট্রগ্রামের মত কন্ডিশনেও অস্ট্রেলিয়াকে হারানো বাংলাদেশের জন্য খুবই কষ্টকর হবে। মিরপুর কন্ডিশন বাদ দিলেই অস্ট্রেলিয়ার সাথে বাংলাদেশের শক্তির ব্যবধান স্পষ্ট। বাংলাদেশ আসলে ক্রিকেট থেকে কতটা পিছিয়ে রয়েছে তা বোঝার জন্য স্পোর্টিং কন্ডিশনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরমেন্স পর্যোলোচনা করলেই বোঝা যায়।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের অবস্থা প্রায়ই অস্ট্রেলিয়ার মত। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১ টি টেস্ট ও ৩ টি-টোয়েন্টির পাশাপাশি ৫ টি ওয়ানডে ম্যাচ জয়ের রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশের। এর মধ্যে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে ১৫ রানের জয়টি অন্যতম ছিল। ২০১১ সালের বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ইংল্যান এই মূহুর্তে কিছুটা ভুগলেও বাংলাদেশের পঞ্চপান্ডবের বিদায়ের পর ইংল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের শক্তি অনেকটা বেমানান মনে হয়। ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল বর্তমানে বাংলাদেশের চেয়ে আফগানিস্তান ক্রিকেট দলকে শক্ত প্রতিপক্ষ মনে করে। 

শক্তির পার্থক্যে দক্ষিণ আফ্রিকা বর্তমানে বাংলাদেশকে যোজন ব্যবধানে পিছিয়ে ফেলেছে। ব্যাটিং, বোলিং আর অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্সের এক মিশ্র সংমিশ্রনে গড়া দল দক্ষিণ আফ্রিকা। দক্ষিণ আফ্রিকাকে এখনো টেস্ট আর টি-টোয়েন্টিতে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে ৬ টি ওয়ানডে জয় রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। তার মধ্যে ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারানো ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমান শক্তির ব্যবধান  অনেকটা বেশি।

তবে বর্তমান পারফরম্যান্স বিবেচনায় বাংলাদেশ শক্তিতে প্রায় সমকক্ষ অবস্থানে রয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার চেয়ে। এতে বড় অবদান বাংলাদেশের চেয়ে দলগুলোর অবনমনে। এক সময় দাপুটে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট কালচার বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট আর ব্যবস্থাপনার মত হওয়ায় নিজেদের শক্তি হারিয়েছে দলগুলো। ফলে বাংলাদেশ এখন এই দলগুলোর বিপক্ষে ভাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারছে। 

সানাথ জয়সুরিয়া, কুমারা সাঙ্গাকার, লাসিথ মালিঙ্কার মত তারকার বিদায়ে শ্রীলঙ্কা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। পাকিস্তান ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি শাহীদ আফ্রিদী, ওয়াকার ইউনুস, ওয়াসিম আকরামদের বিদায়ের পর। অন্যদিতে ব্রায়ান লারা, অ্যান্দ্রে রাসেল, কাইরন পোলার্ড, সুনীল নারাইনদের বিদায়ের পর ধুঁকছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। এই দলগুলোই মূলত বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। শক্তিতে দলগুলো আগের মত থাকলে বাংলাদেশের জয় পাওয়া খুব সামান্য হয়ে যেত। যা আফগানিস্তানের বিপক্ষে পারফরম্যান্স দেখলে বোঝা যায়।

তাছাড়াও ক্রিকেটের প্রতি বিশ্বের অনেক দেশের আগ্রহ কম থাকায় এখনো টিকে আছে বাংলাদেশ। তবে আস্তে আস্তে ক্রিকেট যেরকম বিশ্বে আগ্রহ তৈরি করছে। নিজেদের সময়ের সাথে সাথে মানিয়ে নিতে না পারলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। ইউএসও, আরব আমিরাতের মত দলগুলোও এখন ক্রিকেটে এসেছে। যে দলগুলোর সাথে সিরিজ হারারও রেকর্ড হয়ে গেছে বাংলাদেশের। ফলে বাংলাদেশের সময় ও স্রোত একসাথে না এগোলে মূল্য দিতে হবে মূল্যায়নের অভাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।