চার ছক্কার জাদুকরদের ক্রিকেট বিশ্ব

ক্রিকেট বিশ্ব যখন চার-ছক্কার জাদুকরদের দখলে - এই বিষয়ের ওপর একটি প্রতীকী ছবি।

বেশ কিছু দিন আগেও যারা ক্রিকেটার হতে চাইত তারা শিখতে চাইত নিঁখুত টেকনিক,ধৈর্য ধরে মাঠে টিকে থাকার দৃঢ়তা, মাটি আকড়ে নিজের ইনিংস দীর্ঘ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমান সময়ে ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটের কল্যানে ক্রিকেট এমন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ক্লাসিক ক্রিকেট মানে যেন সময়ের অপচয়।

এইতো কিছুদিন আগেও রাহুল দ্রাবিড়, মোহাম্মদ ইউনুস, সুনীল গাভাস্কার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন অনেকে। কিন্তু সূর্যবংশী, টিম ডেভিড, ফিলিপস সল্টরা চার ছক্কায় এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করে চলেছেন যাতে ক্লাসিক হওয়ার চেয়ে মার কাটারী ব্যাটিংকেই নতুন প্রজন্ম গ্রহন করছেন। এমনকি বিরাট কোহলী, শচীন, রিকি পন্টিংদের ব্যাটিংয়ের অনুসারী দিন দিন তলানীতে।

বর্তমান সময়ে যেসব পিতা মাতা সন্তানদের ক্রিকেটার বানাতে চান তারা আসলেই ‍দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগবে। তারা আসলে রাহুল দ্রাবিড়, বিরাট নাকি টিম ডেভিড, লিয়াম লিভিংস্টোনদের মত ক্রিকেটার বানাবেন। বর্তমান ক্রিকেট এমন একটা পর্যায়ে পোঁছে গেছে যে মাঝে মাঝে বিরাট কোহলীর ব্যাটিংও অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। আইপিএল আসরে বিরাট কোহলী প্রায় ম্যাচেই ১৫০ রানের কাছাকাছি স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করছে। যেটাও যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। বাবর আজম, রোহিত শর্মার মত ক্রিকেটারদেরকেও এখন স্ট্রাইক রেট ইস্যুতে মাঠ থেকে উঠে যেতে হচ্ছে।

ক্রিকেটে ক্লাসিক খেলোয়াড় বনাম পাওয়ার হিটারদের তুলনা এবং তরুণদের পছন্দের কারণ

তবে এর ঠিক বিপরীত চিত্রও রয়েছে। ভারতের সূর্যবংশী নিয়মিত চার ছক্কার বৃষ্টিতে সাজাচ্ছেন বয়স ভিত্তিক আর ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেট লীগের আসর। পিছিয়ে নেই স্বদেশী ও সহযোগী পার্টনার জাসওয়াভী জাসওয়াল, শ্রেয়াস আয়াররাও। বাবর আজম, বিরাট কোহলীর মত খেলোয়াড়দের চেয়ে কি তবে সূর্যবংশীদের মত হতে চাওয়া বড় অন্যায় হবে অভিভাবকদের? কমার্শিয়াল ক্রিকেটের যুগে মুখে না আসলেও মনের কোনে আসতে বাধ্য সবার।

শুধু তাই না ক্রিকেট নিলামেও আকাশচুম্বী দাম থাকে চার ছক্কার বৃষ্টি ঝরানো খেলোয়াড়দের। আর নিলামে অবিক্রিত থাকে জো রুট, স্টিফেন স্মিথের মত খেলোয়াড়েরা। এমনকি বর্তমান সময়ে স্টিফেন স্মিথ, বাবর আজমরা তো নিজ দলেও ডাক সহজে পাচ্ছেন না। ক্লাসিক খেলোয়াড়দের এই হাল অবশ্যই প্রভাব ফেলার কথা পাইপ লাইনে থাকা তরুনদের। ফলে ক্রিকেট নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখছেন তারা তো বিরাট কোহলী, রাহুল দ্রাবিড় হওয়াটাকে চাপ মনে করতেই পারেন।

আর এক ধাপ এগিয়ে গেলে দেখা যায় বিগ হিটিং উপভোগ করার পাশাপাশি কে কত বড় সিক্স মারতে পারল সেটা নিয়েও একটা বাড়তি আগ্রহ দেখা দেয় তরুনদের। ক্রিকেটাররাও যেন এক ধাপ সরস।দর্শকদের কথা মাথায় রেখে বল মাঠের বাহিরে পাঠাতে দ্বিধা বোধ করেন না লিয়াম লিভিংস্টোন, ক্রিস লিনদের মত তারকারা। ক্রিস গেইল, শাহীদ আফ্রিদিদের তো মনে রাখতে বাধ্য হচ্ছে তাদের বিগ হিটিং সক্ষমতার কথা মনে করিয়ে।

পাওয়ার, বিগ, ক্লিন হিটিং, থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি আরও কত বিশ্লেষণ

ক্রিকেটটা এখন এমনভাবে উপভোগ্য করে তোলা হয়েছে যেখানে এক একটি শর্ট কে সাজানো হচ্ছে বিভিন্ন বিশেষনে। এবি ডি ভিলিয়ার্স, সূর্যকুমার যাদবদের শর্টগুলোকে ৩৬০ ডিগ্রিতে বিশ্লেষণ করা হয়। তাছাড়াও ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে ভেসে আসে ক্লিন হিটিং, বিগ হিটিং, ইনোভেটিভ, এগ্রেসিভ সহ আরও কত বিশেষণ। শুধু তাই নয় মাঠের জায়ান্ট স্ক্রিনেও ফুটে ওঠে নানা প্রশংসা। যা মাঠের বাহিরে থেকে আলাদা অনুভুতি জাগায় নবাগত ও অপেক্ষামন ক্রিকেটারদের।

ক্লাস আর পাওয়ার হিটিংকে তুলনায় দাঁড় করিয়েছে ক্রিকেট

ক্রিকেট ক্লাস আর পাওয়ার হিটিংয়ের মধ্যে যেন এখন তুলনা চলে। ক্লাস আর পাওয়ার হিডিং একসাথে পাওয়া অনেকটা কঠিন। বর্তমান সময়ে একটি ভাল বলকেও পাওয়ার হিটিংয়ের মাধ্যমে মাঠের বাহিরে পাঠাচ্ছে ক্রিকেটারা। এমনকি মিস হিটিংয়েও বল যাচ্ছে মাঠের বাহিরে। ক্লাসিক্যাল খেলোয়াড়দের সচরাচর ভাল বল গুলোকে সম্মান করতে দেখা যায়। সাধারণত খারাপ বলের অপেক্ষায় থাকে স্টিফেন স্মিথ, জো রুট, কেন উইলিয়ামসনের মত তারকারা। বিপরীতে টিম ডেভিড, লিয়াম লিভিংস্টোনরা ভাল বলকেও বিভিন্ন স্টাইলে মাঠের বাহিরে পাঠিয়ে দেন। 

আবার ক্রিকেট ক্লাস আর পাওয়ার হিটিং ক্যাপাবিলিটি একই সাথে রয়েছে এমন তারকাও রয়েছে। জাসওয়াভি জাসওয়াল, হ্যারি ব্রুকস, ঈশান কিশানদের মধ্যে রয়েছে সেই ক্যাপাবিলিটি। হয়ত সেই বিষয়টিই পছন্দ হবে তরুনদের। আধুনিক ক্রিকেটের অনুশীলন এখন এই বিষয়টাকেই গুরুত্ব দিয়ে খেলোয়াড়দের গড়ে তুলতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। শুভমন গিলের মত খেলোয়াড়রাও আস্তে আস্তে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে ক্লাসিক আর পাওয়ার হিটিং ক্যাপাবিলিটি দুটোই না থাকায়।

তবে কি সমাধান ক্লাসিক আর পাওয়ার হিটিংয়ের সমন্বয়ে

আগামী প্রজন্ম যারা ক্রিকেটকেই প্রফেশন হিসেবে দেখছেন তাদের হাতে হয়তো ক্লাসিক আর পাওয়ার হিটার এর সমন্বয় ঘটানো ছাড়া উপায় নেই। এক্ষেত্রে ভাগ্য সহায় না হলে হয়তো সক্ষমতা না থাকার কারনে হারিয়ে যেতে হতে পারে অনেককে। যদিও টেস্ট ক্রিকেটকে আদর্শ ক্রিকেট ধরা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে টেস্ট ক্রিকেটারদের ক্লাসকে ঠিক কত জন সমর্থন করছে। ক্রিকেটে টেস্ট ক্রিকেটার হয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে খুব কম সংখ্যক খেলোয়াড়। জই রুট, উমসান খাজারা আদর্শ ক্রিকেটার হওয়ার পরও তাদের নিয়ে কি খুব বেশি ভাবছে ক্রিকেট বিশ্ব।

ফলে হ্যারি ব্রুকস, সূর্যবংশী, ঈশান কিশারাই হয়তো আদর্শ ক্রিকেটার হতে চলেছেন। যারা একই সাথে ক্লাস আর পাওয়ার হিটিং দেখাতে সক্ষম। বর্তমান সময়ের জুনিয়র লেবেলেও প্রাকটিস গুলো মূলত বেসিক ঠিক রেখে পাওয়ার হিটিংকে গুরুত্ব দিচ্ছে। শুভমন গিলদের হাতে ক্লাসিকের সাথে পাওয়ার হিটিং যোগ করার কোন বিকল্প নেই। যা হয়তো হারে হারে টের পাচ্ছেন ভারতের সরফরাজ আহমেদও। ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দেয়া এই ক্রিকেটার হারিয়ে যাাচ্ছেন পাওয়ার হিটিং সক্ষমতার ঘাটতিতে। বাংলাদেশের মুমিনুল হককেও তো ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতে বিবেচনায় রাখা হয়না এই কারন দেখিয়ে। ফলাফল এখন টেস্টেও হারানোর পথে মুমিনুল।

তাই বলা যায় ক্লাসিক্যাল না হয়েও ক্রিকেটে ভালভাবে টিকে থাকা সম্ভব যদি বিগ হিটিং ক্যাপাবিলিটি থাকে। আর সেটা ভালভাবেই সম্ভব। যদি ভাগ্য সহায় হয়ে পারফরমার হয়। তাই আমাদেরকেও নতুন ক্রিকেটের বিশ্বকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় থাকতে হবে।  আর স্মৃতিতে থাকবে শচীন, রোহিত, বিরাট, সাঈদ আনোয়ার, ব্রায়ান লারাদের মত ক্লাসিক্যাল খেলোয়াড়দের ক্লাসিক ব্যাটিং ও ম্যাচের সিচুয়েশনের সাথে মানিয়ে নিয়ে ম্যাচ বের করার মত রোমাঞ্চকর ঘটনাগুলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।