বিশ্ব ক্রিকেটে আম্পায়ারদের নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে আলোচনা কম হয় না। গুরুত্বপূর্ন সময়ে আম্পায়ারদের একটি সিদ্ধান্ত খেলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ন অবস্থান থেকেও অনেক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে অনেক ম্যাচ প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এমনকি চলমান নারী বিশ্বকাপেও আম্পায়ারদের নিরপেক্ষতা নিয়ে মাঠেই খেলোয়াড়দের অসস্তুষ্টি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ছেলেদের এশিয়া কাপেও ভারত পাকিস্তান ম্যাচেও ফখর জামানের ক্যাচ আউট নিয়ে আলোচনা কম হয়নি।
Table of Contents
Toggleআইসিসির আম্পায়ার নির্বাচনের প্রক্রিয়া
| ধাপ | প্যানেলের নাম | দায়িত্ব ও পরিধি | নির্বাচনের প্রধান মানদণ্ড | চুক্তির ধরন ও মর্যাদা |
|---|---|---|---|---|
| ১ | জাতীয় পর্যায়ের আম্পায়ার | নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা (প্রথম শ্রেণি, লিস্ট-এ, টি-২০ লিগ) পরিচালনা করা। | নিজ দেশের ক্রিকেট বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী প্রশিক্ষণ গ্রহণ, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে উচ্চমানের সিদ্ধান্ত প্রদানের অভিজ্ঞতা। | সাধারণত দেশের বোর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ। |
| ২ | আইসিসি আন্তর্জাতিক প্যানেল | আন্তর্জাতিক ওডিআই ও টি-২০ ম্যাচের অন-ফিল্ড আম্পায়ারিং, টেস্ট ম্যাচে চতুর্থ বা সংরক্ষিত আম্পায়ারের ভূমিকা পালন। | জাতীয় বোর্ড কর্তৃক মেধার ভিত্তিতে সুপারিশ লাভ এবং আইসিসি-র অনুমোদন। এই স্তরে নিরপেক্ষভাবে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি। | নিজ দেশের ক্রিকেট বোর্ডের চুক্তিতে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালন। |
| ৩ | এমিরেটস আইসিসি এলিট প্যানেল | ক্রিকেট বিশ্বের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ (সকল টেস্ট ম্যাচ, আইসিসি বৈশ্বিক ইভেন্ট ও প্রধান সিরিজ) পরিচালনা, অন-ফিল্ড ও তৃতীয় আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন। | আইসিসি-এর বার্ষিক পারফরম্যান্স পর্যালোচনা। বিশেষজ্ঞ নির্বাচন প্যানেল কর্তৃক সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা, নির্ভুলতা, ধারাবাহিকতা ও ম্যাচ রেফারিদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্বাচিত। | আইসিসি-এর সঙ্গে সরাসরি এবং পূর্ণকালীন চুক্তিবদ্ধ, সর্বোচ্চ স্তরের আম্পায়ারিং। |
পরীক্ষিত আম্পায়ার হয়েও কেন সমোলোচনা
আইসিসির প্যানেলভূক্ত আম্পায়ারা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর নির্বাচন করা হলেও মাঠে অনেক তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত অনেক দলের বিপক্ষে চলে যায়। তবে বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত তুলনামূলক দুর্বল ক্রিকেট বোর্ড গুলির দলের বিপক্ষে যাওয়ায় সমোলোচনা বেশি হচ্ছে। স্টিভ বার্কনার, ডেভিড শেভার্ড, সাইমন টফেলদের মত আম্পায়ারদের অনেক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বড় দলগুলোর বিপক্ষে একটি সিদ্ধান্ত আম্পায়ারদের ক্যারিয়ার হুমকিতে ফেলতে পারে এই ধরনের ঝুঁকি থেকেই কি আম্পায়ারা কি ঝুঁকিমুক্ত সিদ্ধান্ত দিতে চান এই বিষয়টি আলোচনায় আসছে।
আলোচিত বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সমূহ
| ঘটনা (ম্যাচ, সাল) | বিতর্কিত সিদ্ধান্ত | আম্পায়ার | প্রভাব ও সমালোচনা |
|---|---|---|---|
| ওভাল টেস্ট, ২০০৬ | বল টেম্পারিংয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে পেনাল্টিস্বরূপ ৫ রান দেওয়া | ড্যারেল হেয়ার ও বিলি ডক্ট্রোভ | আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পাকিস্তান দল বিরতির পর মাঠে নামেনি, ফলে আম্পায়াররা ইংল্যান্ডকে জয়ী ঘোষণা করেন (পরে এটিকে ড্র হিসেবে সংশোধন করা হয়েছিল)। |
| সিডনি টেস্ট, ২০০৮ | সৌরভ গাঙ্গুলিকে ভুল ক্যাচে আউট দেওয়া এবং অ্যান্ড্রু সাইমন্ডসকে একাধিকবার ভুল "নট আউট" ঘোষণা করা | স্টিভ বাকনার ও রুডি কোয়ের্টজেন | ম্যাচটিতে আম্পায়ারিংয়ের মান নিয়ে ভারত তীব্র প্রতিবাদ জানায়। এর ফলস্বরূপ, বিতর্কিত আম্পায়ার বাকনারকে সিরিজ থেকে বাদ দেওয়া হয়। |
| আইসিসি বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০১৫ | মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ক্যাচ আউটের সময় ফিল্ডারের পা বাউন্ডারি দড়ি স্পর্শ করেছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক | আলিম দার ও ইয়ান গোল্ড | বাংলাদেশি সমর্থকদের মতে, ফিল্ডার শিখর ধাওয়ানের পা সীমানা দড়ি ছুঁয়েছিল। মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে রিয়াদ আউট হন, যা বাংলাদেশের জয়ের আশা ক্ষীণ করে দেয়। |
| আইসিসি বিশ্বকাপ, ২০২৩ | বিরাট কোহলিকে সেঞ্চুরি পূরণের জন্য ওয়াইড না দেওয়া | রিচার্ড কেটেলবরো | ভারতের জয়ের জন্য মাত্র ২ রান এবং কোহলির সেঞ্চুরির জন্য ৩ রান বাকি—এই পরিস্থিতিতে আম্পায়ার বিতর্কিতভাবে ওয়াইড দেননি, যাতে কোহলি সেঞ্চুরি করতে পারেন। অনেকেই আম্পায়ারের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন। |
| অ্যাশেজ, ট্রেন্ট ব্রিজ, ২০১৩ | স্টুয়ার্ট ব্রডের ব্যাটের কানায় বল লাগা সত্ত্বেও তাকে আউট না দেওয়া | আলিম দার | ব্রড আউট হলেও আম্পায়ার আলিম দার তাকে আউট দেননি। অস্ট্রেলিয়ার কাছে রিভিউ না থাকায় ব্রড টিকে যান এবং তার ইনিংসটি ম্যাচের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। |
| আইসিসি বিশ্বকাপ ফাইনাল, ২০১৯ | বেন স্টোকসের ব্যাটে লেগে ওভার-থ্রো বাবদ ৬ রান দেওয়া | কুমার ধর্মসেনা ও মারাইস ইরাসমাস | ক্রিকেটীয় নিয়মের ভুল ব্যাখ্যার কারণে ইংল্যান্ডকে ৬ রান দেওয়া হয়, যা ম্যাচটিকে টাইয়ের দিকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ইংল্যান্ড সুপার ওভারে জয়লাভ করে। |
| এশিয়া কাপ, সুপার ফোর, ২০২৫ | ফখর জামানের ক্যাচটি মাঠের স্পর্শ পাওয়ার আগে ফিল্ডার পরিষ্কারভাবে ধরেছিলেন কি না, তা নিয়ে তৃতীয় আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত | রুচিরা পালিয়াগুরুগে | ফিল্ডারের হাতে ক্যাচটি যাওয়ার আগে বল মাটিতে ড্রপ খেয়েছিল বলে বিতর্ক তৈরি হয়। তৃতীয় আম্পায়ার আউট দেওয়ায় পাকিস্তান দল অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। |
| নারী বিশ্বকাপ, ২০২৫ | হিদার নাইটের (১৩ রান) সহজ ক্যাচ আউটের সিদ্ধান্তকে টিভি আম্পায়ার কর্তৃক বাতিল করা | গায়ত্রী বেণুগোপালান | ফিল্ডার ক্যাচটি পরিষ্কার ধরেছেন বলে মনে হলেও, টিভি আম্পায়ার 'যথেষ্ট প্রমাণের অভাবের' কথা বলে নট আউট দেন। জীবন পেয়ে নাইট ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেন। |
| টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, ২০২৪ | মাহমুদউল্লাহকে ভুলভাবে LBW আউট দেওয়ার পর ডিআরএস নিয়মের কারণে ৪ রান বাতিল হওয়া | স্যাম নোগাজস্কি | আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে আউট হওয়ার পর রিভিউয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টানো হলেও, আইসিসি-র 'ডেড বল' নিয়মের কারণে বাউন্ডারি হিসেবে যাওয়া ৪ রান স্কোরবোর্ডে যোগ হয়নি, যা ৪ রানের পরাজয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। |
আইসিসির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা
ছোট দলগুলোর বিপক্ষে আম্পায়ারদের প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত থাকার পরেও আম্পায়ারদের খুব বেশি শোনানিতে যেতে হয়নি। যদিও বড় কিছু দলের বিপক্ষে আম্পায়ারদের সিদ্ধান্তের কারণে কিছু সিরিজ থেকে আম্পায়ারদের সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্তও দেখা গেছে। শুধু ছোট দলগুলি নয় বড় দলগুলিকেও অ্যাওয়ে ম্যাচগুলিতে আম্পায়ারদের সিদ্ধানে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ২০২২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে বিরাট কোহলীকে স্টাম্প মাইকে গিয়ে আম্পায়ার ও সম্প্রচারকারী চ্যানেলের সমোলোচনা করতে দেখা গেছে। শুরু থেকে আইসিসি যেন এই বিষয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়র ভূমিকা পালন করছে।
ডিআরএস চালু করেও বিতর্ক থামাতে পারেনি আইসিসি
আম্পায়ারদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তুষ্টি ঠেকাতে আইসিসি ডিআরএস সিস্টেম চালু করে। যেখানে মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে থার্ড আম্পায়ারদের নির্ভূল সিদ্ধান্ত দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে, অন-ফিল্ড আম্পায়ার ডিসিশন এবং সফল সিগন্যাল সহ নানাবিধ কারনে পূরোপুরি সন্তোষজনক কোন ফলাফল আনা যায়নি। এমনকি ডিআরএসের প্রযুক্তিগত ভূল নিয়েও নানা আলোচনা হয়েছে। ২০২৪ সালে মেলবোর্নে যাশস্বী জাসওয়ালের উইকেটের পিছনে একটি ক্যাচ ডিআরএসে ধরা পড়েনি। কিন্তু, স্পষ্ট ব্যাটে লাগার বিষয়টি বোঝা যাচ্ছিল। পরে থার্ড আম্পায়ার সৈকত আউট দিলে এই্ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল।
স্মার্ট ডিসিশন নিতে হবে আইসিসিকে
এতসব আম্পায়ারিং বিতর্কের মধ্যে আইসিসিকে স্মার্ট সমাধানে আসতে হবে। ছোট হোক বা বড় সিদ্ধান্ত যাতে সঠিক নেয়া যায় আম্পায়ার এবং প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে তা সুনিশ্চিত করতে হবে। এমনকি সফ সিগন্যাল, অন ফিল্ড আম্পায়ার ডিসিশন গুলো আরো মূল্যায়ন করে কিভাবে আরো সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে। আম্পায়ারিংয়ের সিদ্ধান্তের কারনে ক্রিকেটের বিশ্বায়ন নিয়ে নানা ভাবে প্রশ্ন আসছে। পাশাপাশি ক্রিকেটকে বিগ থ্রি প্রকোপ মুক্ত করে কিভাবে আরও এগিয়ে নেয়া যায় তা ভাবতে হবে। অন্যথায় ক্রিকেট শুধু এক ঘরে কয়েকটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।