প্রত্যাশা প্রাপ্তির ফারাকে অপমানিত ক্রিকেটারেরা

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ফারাকে হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ক্রিকেটার।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বিমান বন্দরে অপমানিত হওয়ার বিষয়টি নানা ভাবে আলোচনায় আসছে। সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে আফগানিস্তানের সাথে করুনভাবে হোয়াইটওয়াশ হওয়ায় বিমান বন্দরে গিয়ে ক্রিকেটারদের অপমানিত করেছেন ভক্ত সমর্থকরা। নাঈম শেষ, তাসকিন আহমেদ, নাজমুল শান্ত, তাওহীদ হৃদয়দের প্রতি অকথ্য ভাষায় ক্ষোভ ঝেড়েছেন সমর্থরা।

বাংলাদেশ ক্রিকেট ভক্তদের ক্ষোভের অন্যতম যে কারনগুলো মনে করা হচ্ছে সেগুলো হল:

  • দায়িত্ব জ্ঞানহীন শর্ট সিলেকশন
  • .দক্ষতার অভাব প্রদর্শন
  • ব্যাটিং বোলিংয়ে টেকনিক্যাল সমস্যা
  • ধারাবাহিকতার অভাব
  • বিপক্ষ দলগুলোর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে অক্ষমতা
  • নাঈম, শামীম, জাকেরদের নিয়মিত খারাপ পারফরম্যান্স

ভক্তদের তোপের মুখে পড়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা:

ক্রমিক দল (খেলোয়াড়) ঘটনা / উপলক্ষ অপমানের ধরণ / সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া আলোচিত নজির
১ পাকিস্তান দল ২০০৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের কাছে পরাজয় এবং টুর্নামেন্ট থেকে দ্রুত বিদায়। শারীরিক আক্রমণ ও জনরোষ: দেশে ফেরার পর দলের বাস লক্ষ্য করে ক্ষুব্ধ সমর্থকরা পাথর ছুঁড়েছিল। এটি পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম তিক্ত অভিজ্ঞতা।
২ ভারত দল ১৯৯৬ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে লজ্জাজনক পরাজয়। মাঠে দাঙ্গা ও বস্তু নিক্ষেপ: উত্তেজিত জনতা বোতল ও বস্তু ছুঁড়ে মারত। ইডেন গার্ডেন্সে ম্যাচটি আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রীলঙ্কার পক্ষে ঘোষণা করা হয়।
৩ শ্রীলঙ্কা দল নব্বইয়ের দশকে দলের ধারাবাহিক খারাপ পারফরম্যান্স। ক্ষুব্ধ ভক্তরা ক্রিকেটারদের বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে ডিম ছুঁড়েছিল। শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট ভক্তদের চরম হতাশার প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ।
৪ ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল বিভিন্ন সময়ে ঘরের মাঠে খারাপ পারফরম্যান্স। দর্শকরা তীব্র ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান ব্যবহার করত। একসময়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের পতন সমর্থকদের জন্য বেদনাদায়ক।
৫ অস্ট্রেলিয়া দল ১৯৯৪-৯৫ অ্যাশেজে তারকাদের অফ-ফর্ম। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে দর্শকরা বিদ্রূপাত্মক স্লোগান ও কটূক্তি করত। স্টিভ ওয়াহ পরবর্তীতে কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে প্রমাণ করেন।

ক্রিকেট সমর্থকদের ক্ষোভ কতটা যুক্তিযুক্ত

ক্রিকেট নিয়ে আবেগ থাকলেও অতি আবেগ প্রবন হওয়া অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ। এতে খেলাধুলার যে সৌন্দর্য সেটা নষ্ট হয়। তবে যে কারনে ক্ষোভ যুক্তিযুক্ত তা হল:

  • সময় ব্যয় করে ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেখতে না চাওয়া।
  • খেলোয়াড়দের মানহীন পারফর্মেন্স।
  • গুরুত্বপূর্ন সময়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রন হারানোর ধারাবহিকতা।
  • দেশ ও জনগনের টাকায় সমস্ত সুযোগ সুবিধা পেলেও কাজে লাগাতে ব্যর্থ।

যে কারনে অতিরিক্ত ক্ষোভ দেখানো উচিত নয়

ক্রিকেটের প্রতি অতিরিক্ত ভালবাসা থাকলেও যে কারনে অতিরিক্ত ক্ষোভ দেখানো উচিত নয়:

  • আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়।
  • খেলোয়াড়দের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
  • তরুন প্রজন্ম ক্রিকেট আসতে অনীহা প্রকাশ করতে পারে।
  • মনুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ক্রিকেটারদেরও দায়িত্ব নেয়া শিখতে হবে

তবে সব কিছুর পরেও ক্রিকেটারদেরও কিছু দায়িত্ব নেয়া উচিত। ক্রিকেটারদের করনীয় কি কি থাকতে পারে:

  • ব্যাটিংয়ে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
  • ম্যাচের বিশেষ মূহুর্তে চাপ সামলানোর ক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
  • ক্রিকেটীয় স্কিল বৃদ্ধি করতে হবে।
  • জয়ের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে।
  • পাওয়ার হিটিং দিয়ে দর্শকদের উচ্ছ্বাস বৃদ্ধি করতে হবে।

দর্শকদের হতাশা মেটাতে বিসিবিকেও দায়িত্ব নিতে হবে

নাঈম, তাসকিনদের নিয়ে হতাশা থাকলেও এই ব্যর্থতার দায় শুধু খেলোয়াড়দের নয়। ম্যাচের পর ম্যাচ ব্যর্থ হলেও হাতে বিকল্প না থাকায় অফ ফর্ম খেলোয়াড়দের দিয়ে দল সাজাতে হয়। তাছাড়া খেলোয়াড়রা যখন বুঝতে পারে নিজেদের বিকল্প নেই তখন দলে জায়গা হারানোর শঙ্কায় থাকে না। বিসিবি খেলোয়াড় উঠে আসার পাইপ লাইন তৈরি করতে ব্যর্থ। ফলে ক্রিকেটারদের প্রতি ভক্তদের এই হতাশা বিসিবির ব্যর্থতারও প্রমাণ।

ঘরোয়া ক্রিকেটকে করতে হবে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক

একটি দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের উপরই মূলত সে দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে বর্তমান সমস্যার জায়গাটা মূলত এই কারনেই। নিম্ন মানের ঘরোয়া ক্রিকেট আসর ও মানহীন ক্রিকেটারদের দিয়ে ক্রিকেট পরিচালনা বাংলাদেশের ক্রিকেটের মূল সমস্যা। ভাল মানের দেশী বিদেশী ক্রিকেটারদের নিয়ে ঘরোয়া ক্রিকেট পরিচালিত করতে পারলে ক্রিকেটের মান উন্নত হতে অবশ্যই বাধ্য।

ক্রমিক কাঠামোর ক্ষেত্র দুর্বলতা বা মানহীনতার প্রকৃতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এর প্রভাব
১ ঘরোয়া ক্রিকেটের উইকেট স্পিন-নির্ভর পিচ: অতিরিক্ত স্পিন-সহায়ক উইকেট, যা স্বাভাবিক খেলার সুযোগ কম দেয়। ব্যাটসম্যানরা গতি ও বাউন্স সামলানোর অভ্যাস গড়তে পারে না।
২ টুর্নামেন্টের ক্যালেন্ডার অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম: পর্যাপ্ত খেলার অভাব, টুর্নামেন্ট বারবার পেছানো। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্য, মানসিকতা ও ফিটনেস তৈরি হয় না।
৩ খেলোয়াড় তৈরির পাইপলাইন প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনার সঠিক প্রক্রিয়া বা মানসম্মত একাডেমি কাঠামোর অভাব। আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়ের স্থির সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় না।
৪ প্রশাসন (BCB) এবং রাজনীতি বোর্ড পরিচালকদের নির্বাচন প্রায়শই রাজনৈতিক বা অন্যান্য প্রভাবের ভিত্তিতে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয় না এবং স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের অভাব দেখা যায়।
৫ কোচিং ও প্রশিক্ষণ মানসিক চাপ সামলানো এবং টেকনিক্যাল দুর্বলতা কাটানোর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। খেলোয়াড়রা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
৬ ঘরোয়া ক্রিকেটের তীব্রতা টুর্নামেন্টগুলো আন্তর্জাতিক ম্যাচের তীব্রতার ধারেকাছেও থাকে না। ক্রিকেটাররা জাতীয় দলে এসে চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন।

ক্রিকেটীয় বেসিক ঠিক করে ফলাফল আশা করতে হবে

ঘরোয়া ক্রিকেট সহ ক্রিকেট কাঠামোর সংস্করণ করা ছাড়া ক্রিকেটারদের কাছে বড় আশা করা বোকামীর সামিল। কেন বাংলাদেশ ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে ক্রিকেট খেললেও ধারাবাহিক হতে পারছে না। তার উপযুক্ত কারণ নিয়ে কাজ করতে পারলে সফলতা আসবে। না হলে হতাশা, অপমান, ব্যর্থতা হবে নিত্যদিনের সঙ্গী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।